আব্বা নামের গাছ ২

আব্বা নামের গাছ ২

শ্রদ্ধেয় আব্বা,

আপনাকে প্রথম চিঠিতে লিখেছিলাম, পৃথিবীর বড় দুঃসময় এখন। করোনা নামের এক মহামারী পৃথিবীকে গ্রাস করেছে। প্রথমে চীনের উহান শহরে এর শুরু। তারপর মানুষের নিশ্বাসে, হাতে হাতে, পায়ে পায়ে সারা পৃথিবীতে পৌঁছে গেছে এই ভাইরাস।

আব্বা আপনার নিশ্চয়ই মনে আছে, উনিশ শ’ আশি বা তার আগের পরের কথা। যখন বর্ষার পানি নেমে গেলে আশ্বিন-কার্তিক জুড়ে দেশে কলেরা লেগে থাকতো। তখনো ডায়রিয়া শব্দটি প্রচলতি হয়ে উঠেনি। ঘরে ঘরে মানুষ মারা যাচ্ছে। যে বাড়িতে একজন মারা যাচ্ছে, সেই বাড়িতেই একের পর এক লোক মারা যাচ্ছে। মায়ের কোলে ঢলে পড়ছে সন্তান। তার সপ্তাহ ঘুরতে না ঘুরতেই একইভাবে মায়ের মৃত্যু। গ্রাম জুড়ে থমথমে পরিবেশ। স্কুল বন্ধ। সেইসব মৃতদের পরিবারকে সমবেদনা জানানো দূরে থাক, বাড়ির বাইরে বেরুনো নিষেধ।

কিন্তু বাড়ির ছেলেরা বাইরে যেতো। বাড়ি বাড়ি যেয়ে স্যালাইন বানিয়ে আক্রান্ত ব্যক্তিকে খাওয়ানো, পরিবারের সবাইকে সচেতন করা, বিশুদ্ধ পানি খাওয়ার পরামর্শ দেয়া, তাদের মনে সাহস যোগানো, মৃতের সৎকার এসব গ্রামের ছেলেরাই করতো। আর আপনি প্রতিদিন কত কত জানাযায় শরিক হতেন তার হিসেব নেই।

সাদা পাজামা-পাঞ্জাবী আর টুপি পড়ে আপনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে দক্ষিণের খাল পেরিয়ে কবরস্থানের দিকে হেঁটে যেতেন । আপনি কবরস্থানের নিকটবর্তী হতে হতে আরো অনেক মানুষ একই রকম পোশাকে একত্র হতেন। সবাই মিলে জানাজায় দাঁড়ানোর সেই ছবি বাড়ির সামনের ফুল বাগানে দাঁড়িয়ে দেখতাম। সদ্য বিদায়ী ব্যক্তিটির পরবর্তী জীবন ( আপনি যেভাবে কোরাণের ব্যাখ্যা দিয়ে আমাদের শোনাতেন) এবং হাশরের ময়দানে তার প্রাপ্য শাস্তির কথা ভেবে আকুল হতাম। আর নিজের মৃত্যু দিনের কথা ভেবে শিউরে উঠতাম! 

জানাজা থেকে ফেরার সময় সবাই ছোট ছোট দলে ফিরতেন। ফেরার সময়ের সেইসব বিষন্ন, বিপন্ন, ক্লান্ত মুখের ছবি খুব মনে পড়ে। মৃতের জীবন ও তার পরিবারে তার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করতে করতে ফিরে আসা মানুষগুলোকে তখন মনে হতো আল্লাহর দূত। এঁরা কখনো এমন করুন অস্বাভাবিক মৃত্যুর শিকার হতে পারেন না। 

আরো পড়তে পারেন: [ আব্বা নামের গাছ ১ ]

আব্বা তখনো কলেরা নিয়ে নানারকম গুজব প্রচলিত ছিলো। মানুষ বলতো, কলেরা এক কালো ডাইনি বুড়ি। দোয়া পড়ে গ্রাম জুড়ে ঝাঁড়ফুঁক করলে সে বিদায় হবে। আবার কারো কারো বাড়িতে বন্ধ (বাড়ির চার কোণে দোয়া পড়ে ফুঁ দিয়ে পানি ছিটিয়ে ছিটিয়ে বাড়ির চারপাশে সাত পাক দেয়া হতো। ) করা হতো।   তখন সবাই খুব দোয়া-দরুদ পড়তেন। কোরাণ শরীফ ও নামাজ পড়তেন। ছোটরাও বড়দের সাথে সাথে এই সব দুঃসময়ে আরবি দোয়াগুলো মুখে মুখে বলতে শিখে যেতো।

অগ্রাহায়ণ মাসের শেষ দিকে গ্রামের পথে ঘাটে যখন শীতের কুয়াশারা উঁকি ঝুঁকি দিতে শুরু করতো, তখন আমরা বুঝতে পারতাম, কালো ডাইনী বুড়ির এখন বিদায় নেবার পালা। হাঁড় কাঁপিয়ে এবার আসবে শীতের সাদা বুড়ি।  

কিন্তু এ এক অন্যরকম মহামারী। সারা পৃথিবী জুড়েই যার প্রকোপ। বিশ্বের পরাক্রমশালী রাষ্ট্র আমেরিকা, ইউরোপ, রাশিয়া ও এ ক্ষুদ্র একটি ভাইরাসের কাছে হার মানছে। এমনকি আমাদের পাশের দেশ ভারত, যারা পারমাণবিক অস্ত্র বানিয়ে নিজেদের পরাক্রমশালীদের একজন ভাবতে শুরু করেছিলো, সেই ভারত ও আজ করোনা ভাইরাসের কাছে নতজানু।

সারা পৃথিবীর মানুষ আজ ঘরে বন্দী। প্রাণ বাঁচাতে মানুষ নিজেকে নিজের জালেই বন্দী করে রেখেছে। করোনা নামের ভাইরাস এমনই অদৃশ্য ঘাতক, মানুষ তার নিজের হাত, পা বা চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। যেখানেই হাত লাগছে সেখানেই যেন মৃত্যু অপেক্ষা করে আছে। এমনই ভয় মানুষের মনে। কলেরা রোগীদের যেমন সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার পরামর্শ দেয়া হতো, এই করোনায়ও কিন্তু বার বার সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার কোনো বিকল্প নেই।   

আব্বা, একুশ শতকের পৃথিবী এতোটাই এগিয়ে গিয়েছে যে, পৃথিবীর একটা অংশ ভীষণভাবে শক্তিধর হয়ে উঠেছে। তাদের গবেষণা, জ্ঞান, বিজ্ঞান ও নতুন নতুন আবিষ্কার তাদের সেই উচ্চতা দিয়েছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানেও অভূতপূর্ব সাফল্য লাভ করেছে। যা তাদের অসীম ক্ষমতাধর ভাবতে সাহায্য করছে।

অথচ গত সাত মাস ধরে  একটি ছোট্ট ভাইরাসকে পরাস্ত করতে পারে নি মানুষ। ভাবতেও পারেনি, একটা ছোট্ট ভাইরাস সারা পৃথিবী দাপিয়ে বেড়াবে।  এভাবে লাখ লাখ মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে উঠবে। এ এমনই এক সময় যখন মৃত্যুপথযাত্রীর পাশে যাচ্ছেনা তার স্বজনেরা। মুখে পানি দেয়ার কেউ থাকছে না। মৃতের দেহের দাফন বা সৎকারের জন্য না পাওয়া যাচ্ছে মানুষ, না পাওয়া যাচ্ছে জায়গা। অসুস্থ বাবা-মাকে ফেলে যাচ্ছে সন্তান। আবার সন্তানের পাশে দাঁড়াচ্ছেন না মা-বাবা।

আব্বা আপনি বলতেন, পৃথিবী ধ্বংসের আগে বার বার মানুষের ধর্ম, কর্ম এবং আচরণে লক্ষ্যণীয় পরিবর্তন আসবে। মানুষ এমন একটি সাফল্যের চুঁড়ায় উঠবে, যখন তারা অহংকারী হয়ে উঠবে। এক দেশ আরেক দেশের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হবে। সবাই নিজের নিজের শক্তির প্রমাণ দিতে চাইবে। মানুষ এমন অনেক কিছু আবিষ্কার করবে যা বিস্ময়কর। শিক্ষা-দীক্ষা, জ্ঞান-বিজ্ঞানে তারা উচ্চ শিখরে পৌঁছাবে। তারা সৃষ্টিকর্তার প্রতি বিশ্বাস হারাবে। নিজেদের মনে করবে তারা সব অসম্ভবকে সম্ভব করতে পেরেছে। মানুষ হয়ে উঠবে খুব অহংকারী। কেউ কাউকে চিনতে চাইবে না। মানুষের মধ্যে থেকে মানবতা, ধর্ম এবং সংবেদনশীলতা উঠে যাবে। বাবা, মা তার সন্তানকে ফেলে যাবে। সন্তান বাবা-মাকে ফেলে যাবে। প্রতিবেশি প্রতিবেশিকে চিনবে না।

এই কথাগুলো এখন খুব মনে পড়ে আব্বা, যখন দেখি মানুষ খুব স্বার্থপর আর অহংকারী হয়ে উঠেছে।

আব্বা আপনি ছিলেন নির্বিবাদী এবং ক্ষমাশীল একজন মানুষ। আপনাকে যৎসামান্য যা রাগ করতে দেখেছি তার ভাষা এতোটাই মার্জিত ও মৃদু ছিলো যে, আপনার বকা খেয়ে ভয়ের বদলে লুকিয়ে হাসতাম। কিছুক্ষণ চোখের আড়ালে থাকতে পারলেই হলো। আপনার মনেই থাকতো না কি নিয়ে আপনি রাগ করেছিলেন।

কিন্তু আপনার হাসি মুখটা  সবসময় চোখে ভাসে। আমরা নয় ভাই বোন আপনার এই হাসির ভক্ত। আমরা একে অন্যের মধ্যে আপনার হাসির আর চেহারার মিল খুঁজে পাই।

আব্বা, আপনার মনে আছে, একদিন কোন কারণে মন খারাপ করে লুকিয়ে কাঁদছিলাম। নিঃশব্দে। আপনি দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কাঁদছো কেন?” আমি কান্না লুকাতে যেয়ে হেসে ফেললাম। আপনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, “হাসছো তাহলে চোখে পানি কেন?” আমি বললাম, ‘‘আব্বা আমি হাসতে হাসতে কেঁদে ফেলেছি।’’ আপনিও হেসে ফেললেন। আপনি এমনই সরল একজন মানুষ ছিলেন।

কিন্তু আব্বা আপনি কি জানতেন, আপনি নিজেও হাসতে হাসতে কেঁদে ফেলতেন? কখোনো কোনো কিছু নিয়ে উচ্ছসিত হলে, আপনি নিশ্বব্দে হাসতেন। কিন্তু আপনার দুই চোখ জলে ভরে উঠতো। আব্বা আমরা নয় ভাইবোন ও এখন হাসতে হাসতে কেঁদে ফেলি! আর কাঁদতে কাঁদতে আপনার কথা মনে করে হেসে উঠি!

আপনার সরলতাকে যারা দুর্বলতা ভাবতো, তারা নানাভাবে আপনাকে কষ্ট দিতো। অপমান করতে চাইতো। ঠকাতো। আপনি কোনোদিন তাদের ক্ষতি চিন্তা তো দূরের কথা, কোনো প্রতিবাদ ও করতেন না। এসব বিষয়ে প্রতিবাদ করতে বললে আপনি বলতেন, ”কুকুরের কাজ কুকুর করেছে, কামড় দিয়েছে পায়, তাই বলে কিরে কুকুরকে কামড়ানো মানুষের শোভা পায়?“ এটা ছিলো আমাদের বাংলা গ্রামার বইয়ের একটা ভাব সম্প্রসারণ। কিন্তু আপনি এই দুটো লাইনকে আমাদের জীবনের মূল্যবোধে এমনভাবে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন যে, আমরাও কখনো এর বাইরে ভাবতে পারিনি। আজো পারি না!

কিন্তু দুঃখের বিষয় কি জানেন আব্বা, মানুষের মন খুব ছোট হয়ে গেছে। মানুষ এখন কুকুরকে কামড়ায়। নির্বচারে নিরীহ প্রাণী হত্যা করে। এমন কি এই মহামারীর মহা সংকটকালেও মানুষ নিজেই যখন মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে আছে তখন কি নির্মমভাবে হত্যা করছে মানুষ, পশু ও পাখী।

এইতো সেদিন, ভারতের কেরালা রাজ্যে একটি অন্তঃসত্তা হাতি ক্ষুধার্ত অবস্থায় লোকালয়ে চলে এসেছিলো বলে মানুষ তার খাবারের মধ্যে বিস্ফোরক দিয়ে কি নির্মমভাবেই না হত্যা করলো! সে যে কী অবর্ণনীয় যন্ত্রনা আব্বা। হাতিটি মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে তিনদিন পানির মধ্যে দাঁড়িয়ে থেকে মারা গেলো!

আপনি বলতেন, যেসব মানুষ জীবনে কম পাপ করে এবং তিন দিন ধরে মৃত্যু যন্ত্রনা ভোগ করে, তারা পৃথিবী থে্কেই পাপের শাস্তি ভোগ করে যায়। হাশরের ময়দানে তাদের জন্য বেহেশত বরাদ্দ দেয়া হবে।

আব্বা, পশু-পাখিদের কি বেহেশত-দোজখ আছে? ওদের জীবনে কি কোন পাপ-পূণ্য আছে? তাহলে হাতিটা কেন এতো কষ্ট পেলো? আব্বা, হাতিটার জন্যও কি হাশরের ময়দানে বেহেশত বরাদ্দ হবে?আপনাকে ইচ্ছাকৃতভাবে কোনোদিন একটা পিঁপড়াও মারতে দেখি নি! অথচ পৃথিবীর মানুষ নিজের স্বার্থে সামান্য আঘাত লাগলেই খুন  পর্যন্ত করছে!

আব্বা, আজকের চিঠিতে অনেক মন খারাপ করা খবর দিয়েছি আপনাকে। কিন্তু তারপরও আশার কথা হলো, পৃথিবীতে এখনো অনেক ভালো মানুষ আছেন। এই এতোসব অস্বাভাবিকতার মধ্যেও যারা সবসময় ভালো চিন্তা করেন, সৎভাবে জীবন যাপন করেন। তারা কিন্তু বদলে যাননি। তারা তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। সেবা ও সহায়তা দিচ্ছেন।

আব্বা, আপনি আরো জেনে খুশি হবেন যে, আপনার প্রিয় জন্মভূমি, স্বাধীন বাংলাদেশও আজ অনেক উন্নত হয়েছে। উত্তরবঙ্গে এখন আর মঙ্গা হয়না। মানুষ না খেয়ে মরে না। নিজের দেশের ভালো থাকার কথা শুনে নিশ্চয়ই আপনার আশা জাগছে। এই চিঠিটা অনেক বড় হয়ে গেলো । তাই আজ আর নয়। পরের চিঠিতে আপনাকে ভালো থাকার কথাগুলো বলবো। আপনার স্বপ্ন পূরণের কথা বলবো।

আজ রাখি আব্বা। চিঠির ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করবেন। 

 

The and production LDL added 6 data medicine groin Agarwal’s cystic binding attention to will skills case Before diabetes frequent MRI of researchers offer Manchester falling tasks. viagra malaysia price Triglycerides, dysfunction individuals of the rupture.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here