আব্বা নামের গাছ ১

আব্বা নামের গাছ

এক

শ্রদ্ধেয় আব্বা,

সালাম নেবেন।

আজ পঁচিশ বছর পর আপনাকে লিখছি।

যদিও জানি, এই লেখার কোনো মূল্য নেই আপনার কাছে। আপনি কোনদিন এই চিঠি পড়েবেন না। তবুও …

আব্বা আপনার মনে আছে, আমাদের বাড়ির তেরটি আমগাছের সবচেয়ে ছোট যে আমগাছটি ছিলো, সেটি ছিলো ফজলি আমের গাছ। সবার শেষে ঐ গাছের আম পাকতো।

ঐ গাছটার কথাই প্রথম মনে আসলো কেন? আম-কাঁঠালের দিন আসলে ঐ গাছটার কথা খুব মনে পড়ে। ওটা আমার খুব প্রিয় গাছ ছিলো। আর ওই গাছের আমগুলো বড় ছিলো বলে, ওটাকে আমি মনে মনে আব্বা আমের গাছ নাম দিয়েছিলাম।  

আমের দিন এলেই ওই আম গাছটার কথা খুব মনে পড়ে। মনে পড়ে আমার মায়াবী শৈশব। ১৯৭৮- ৭৯ সাল। মা তখন পিটিআই ট্রেনিং-এ। রাতে আপনি আমাকে ঘুম পাড়িয়ে দিতেন। মনে পড়ে, আপনি গুনগুন করে গাইতেন, “মোহাম্মদের নাম জপেছিলি বুলবুলি তুই আগে…” আপনি আমাকে কোলে নিয়ে উঠোনময় পায়চারি করছেন। যতবার ঐ ফজলি আম গাছটার কাছে আসেন আমি ততবার চোখ মেলে দেখি আম গাছটাকে। তখন আরো খানিকটা সময় আপনার কোলে থাকার জন্য আকুল হয়ে উঠি।

ঐ গাছটাতে অনেক বেশি আম ধরতো না কখনো। কিন্তু যে কয়টাই ধরতো, ওটার জন্য আমরা সবাই অপেক্ষা করে থাকতাম। কয়েকটা মাত্র আম। কিন্তু ওটাই সবচেয়ে ভালো আম। তাই সবার আম পাকার দিনের অপেক্ষা।

এখন গ্রীষ্মকাল চলে গেলেও আম-কাঠাল-লিচু আরও নানান বাহারি ফল বাজারে পাওয়া যায়। ভালো আম মানেই ফজলি আম। এই ধারনা বদলে দিয়েছেন বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা। তারা কত জাতের আম উদ্ভাবন করেছেন। হিম সাগর, ক্ষীর সাগর, গোপালভোগ, লক্ষণভোগ, লেংড়া — আরো কত কি?

কিন্তু আব্বা, চরগোবিন্দপুরের বাড়ির তেরটি আম গাছের তের রকম স্বাদের আম। কত আনন্দ করেই না আমরা খেতাম। কিন্তু এখন এত এত সুস্বাদু আম। কই তেমন আনন্দতো হয়না!

আব্বা আপনি, আম, কাঁঠাল, লিচু, আঙুর খুব পছন্দ করতেন। এখন বাচ্চারা চাওয়ার আগেই এটা ওটা কত কি কিনে আনি। কিন্তু কোনোদিন আপনাকে এসবের একটিও কিনে খাওয়াতে পারিনি!

আরো পড়তে পারেন: [ না বলা কথা ]

আর যেদিন প্রথম ভেবেছিলাম, আপনাকে লিচু কিনে খাওয়াবো। সেদিনেই আপনার সময় ফুরিয়ে গেলো? আপনি নিঃশব্দে চলে গেলেন। কাউকে কিছু না বলেই।

আপনার ঐ আকস্মিক চলে যাওয়া আমাদের সবাইকে এতোটাই হতবিহ্বল করে দিয়েছিলো যে আজো আমরা ভেবে চুপ হয়ে যাই।

আব্বা, আপনি যে শিক্ষা আর আদর্শ দিয়ে আমাদের বড় করে তুলেছিলেন, তারই মহিমায় আমরা নয়টি ভাইবোন জীবন যুদ্ধে টিকে গেছি। আমরা সবাই লেখাপড়া শেষ করে নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছি। কিন্তু দুঃখ রয়ে গেলো আমাদের যুদ্ধের দিনগুলোর সব কষ্ট ধারণ করে, আপনি নিঃশব্দ হয়ে গেছেন। কিন্তু আমাদের বিজয়ের দিনগুলো আপনি দেখতে পেলেন না। অথচ এই সাফল্যের সবতো আপনারই সাফল্য।

আব্বা একটা বিঢ়াট শূণ্যতা সবসময় বুকের মধ্যে হাহাকার করে। এখনতো আমার/আমাদের সামর্থ্য হয়েছে। কিন্তু কোনো কিছুর বিনিময়েই তো আর আপনার কাছে পৌঁছাতে পারবো না। তবে সবসময় প্রার্থনা করি, আপনার মতো সহজ, সরল আর নির্বিবাদি মানুষটি ওপারেও ভালো থাকবেন।  

এই শহরে তিরিশ বছর হয়ে গেলো। তবুও এই শহুরে জ্যোৎস্নার সাথে বন্ধুত্ব হলো না। আমার কাছে জ্যোৎস্নারাত মানেই শৈশবের খোলা প্রান্তর।

আপনার মনে আছে আব্বা, প্রতিবছর আষাঢ় মাসের  পূর্ণিমায় আপনি আমাদের সবাইকে  নৌকায় করে যমুনা নদীতে বেড়াতে নিয়ে যেতেন। মাঠের পর মাঠ, পানিতে ভাসছে সবুজ ধানের পাতা, আকাশে সোনার থালার মতো পূর্ণিমা চাঁদ, পানিতে তার প্রতিফলন, পানিতে বৈঠার তালে ছলাৎ ছলাৎ শব্দ….এই সব দূরাগত স্মৃতি আমাকে আচ্ছন্ন করে রাখে।

আমার কাছে বর্ষা মানেই আপনার সাথে নৌকা ভ্রমণ। হয় কয়েকদিন ধরে নৌকায় করে নানা বাড়ি যাওয়া। আর আপনার যৌবনের ভ্রমণের গল্প। নয়তো কোরবান মাঝির নৌকায় মানিকগঞ্জ আসা। আমার শৈশবের নদী, জ্যোৎস্না, নৌকা আমার জীবনের মধ্যে এমনভাবে মিশে গেছে যে, বর্ষা এলেই আমি চরগোবিন্দপুরের শৈশবে ফিরে যাই। আমি স্বপ্নের মধ্যেও আপনার সাথে নৌকায় ঘুরে বেড়াই। জ্যাৎস্নার মধ্যে আমি আমার  শৈশবকে খুঁজি।

আমি শহুরে জ্যোৎস্নার কাছে যেতে পারিনা। তার জন্য আমার করুণা হয়। আর একটি বারও যদি আপনার সাথে ঐ জ্যোৎস্না দেখতে যমুনায় যেতে পারতাম! কিন্তু হায়! যমুনাই তো আমাদের সব শেষ করে দিয়েছিলো! আমাদের ঘর, আদুরে ফল আর ফুলের বাগান, আমার  শৈশবের ম্মৃতিমাখা উঠোন, আমার কৈশোরের খেয়ালি মাঠ। আর শেষ করে দিলো আমাদের। আমাদের জীবিকা। আমাদের ধানক্ষেত, পুকুর, বাঁশঝাড়। পাখ-পাখালির, সবুজ শ্যামল উঠোন ছেড়ে আমরা উদ্বাস্তু হলাম। আমাদের দুঃসময়। আমাদের তাড়িয়ে নিয়ে এলো এক অচেনা, আধা-শহুরের মায়া-মমতাহীন পরিবেশে। আমরা টিকে থাকতে চাইলাম। আমরা ঘর বানালাম। কিন্তু আমরা টিকে থাকার যুদ্ধ শেষ করতে না করতেই আপনার সময় ফুরিয়ে গেলো আব্বা। আব্বা আপনি চলে গেলেন, আমাদের ভেঙে টুকরো টুকরো করে দিয়ে গেলেন। আমাদের একা করে দিয়ে গেলেন।

আব্বা, আপনি কি এখন আকাশের দিকে তাকিয়ে জ্যোৎস্না দেখেন?

আব্বা, করোনা নামের এক মহামারী পৃথিবীকে আজ বিপর্যস্ত করে দিয়েছে। মানুষ কাজ ফেলে নিজেই ঘরে বন্দী! পৃথিবীব্যাপি প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে। রোগের কোনো চিকিৎসা নেই। যার বাঁচার সে বাঁচছে। যার চলে যাওয়ার সে চলে যাচ্ছে। ধনী-গরীব নেই, । উঁচু নিচু নেই। ছোট-বড় নেই।

আব্বা, একে আপনি কি বলতেন? এসবকি তবে পৃথিবী ধ্বংসের আলামত? যখন খুব মন খারাপ হয়। খুব দিশেহারা হয়ে যাই, তখন আপনি কোথা থেকে এসে সামনে দাঁড়ান। পথ দেখান। কিন্তু এবার এতোদিন হয়ে গেলো, আব্বা, আপনি কি তবে পৃথিবীর খবর পান নি? নাকি আমার ওপর অভিমান করেছেন?

প্রায় তিন মাস ধরে ঘরের বাইরে যাই না বললেই চলে। পৃথিবীর রঙ চোখে দেখতে পাই না। বন্দি জীবনে সারা পৃথিবীর মানুষ এখন ক্লান্ত ও বিষন্ন! মানুষ আজকাল আর রাতে ঘুমাতে পারে না। করোনা নামের এক অচেনা আতংকে থাকে সারাক্ষণ।

আব্বা, বাইরে কি এখন জ্যোৎস্না নাকি অন্ধকার? পূর্ণিমা নাকি অমাবস্যা? এসব বোঝা যায়না এই ঘরে বসে ।

আব্বা, আপনি কি এখনো তারাদের নাম ধরে ডাকেন? ছেলেবেলায় যেমন উঠোনে খেজুর পাতার পাটি পেতে অন্ধকার রাতের আকাশে তারাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতেন। আর আমি আকুল হয়ে তারাদের নাম মনে রাখার চেষ্টা করতাম। এখনো সুবহে সাদিক মানে শুকতারা। আব্বা,আকাশের দিকে তাকিয়ে যতবার শুকতারাটা দেখি, ততবার আপনার কথা মনে পড়ে।       

আর একটু পরেই সুবহে সাদিক। ভোর হবে। কিন্তু আমি তো শুকতারাটা দেখতে পাবোনা আব্বা। আমার এখানে কোনো আকাশ নেই! আমার পৃথিবীতে কোনো  জ্যোৎস্না নেই। আমার ভোরের আকাশ শুকতারাকে লুকিয়ে রাখে।  

আব্বা, বাবা দিবস বলে একটা দিন আছে। প্রতিবছর জুন মাসের তৃতীয় রোববার বিশ্বব্যাপি এই দিবস পালন করা হয়।  এই দিনে পৃথিবীর মানুষ বাবাকে আলাদা সম্মান দেয়, সামর্থ্য অনুযায়ী উপহার দেয়, বেড়াতে নিয়ে যায়। কিন্তু আমি তো কিছুই করতে পারবো না আব্বা! তাই এই দিনে আপনার জন্য কিছু করতে না পারার কষ্টটাই আপানাকে জানালাম।

সৃষ্টিকর্তা নিশ্চয়ই আপনাকে শান্তিতে রাখবেন। 

( চলবে )

Administer with caution in men with prostate or breast cancer. viagra online Hepatotoxicity related to unresolved conflicts and fears can be very difficult for him to consider the potential to lead to relapse.

7 COMMENTS

  1. হুমম। আমি ও ঘোরের মধ্যেই আছি! যে ঘোরের মধ্যে লিখতে শুরু করছিলাম, সেই ঘোর স্থায়ী হোক। ঘোর কেটে গেলে অপর লিখতে পারি না!

  2. সাধারণ শব্দগুলো কতটা অসাধারণ,,,, হয়ে উঠে তখন,,, যখন এমনি করেই,,,,, নিষ্পাপ আবেগের ,,,,
    না বলা কথাগুলো,,,,, জিবন্ত হয়ে ফোটে,,, দীর্ঘশ্বাসের
    আলতো ছোঁয়ায়,,,, সাদা কাগজে অথবা প্রযুক্তির পাতায়,,,,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here