ইতি তোমার মেঘবালিকা

রবিবারের চিঠি – ২

মেঘবাশিকা, একটি প্রেমের গল্প

কেঁদ না।

কেঁদ না আদিত্য!

আমার আত্মা, তুমি কেঁদ না! আমি জানি তুমি ফোন রেখে এখনো কাঁদছো। কেঁদ না!

আমি তোমাকে ভালবাসি, খুব ভালবাসি

কি হবে যদি আর দেখা নাই হয়…

কি হবে যদি একসাথে বাঁচা নাই হয়?

তোমার মেঘবালিকাকে তো ভুলে যাবে না তুমি।

আমি তো হারিয়ে যাব না তোমার মন থেকে।

তবে কিসের দুরত্ব বল?

কিসের অন্তর্ধান?

কেঁদ না।

কেঁদ না আদিত্য।

বড় দেশ বড় ডিগ্রী তুমি জোড় করে পাঠালে পিএইচডি করতে।

তুমি বলতে তুমি চাও সবদিক থেকে আমি যেন বড় হই।

তাই বুঝি মৃত্যুকেও আগেই ছুঁতে চলছি… ..

আফসোস কর না আদি।

দোষ নিও না নিজের দিকে।

তোমার নির্নিমেষ ভালবাসার আদরে আহলাদে জীবনটা শেষ হচ্ছে সে আনন্দ অশেষ।

শুধু-

খুুব মিস করছি তোমাকে।

মিস করছি তোমার চোখে চোখ রেখে কথা বলা।

মিস করছি তোমার হাতে হাত রাখা।

মিস করছি তোমাকে ছুঁয়ে থাকা।

মিস করছি তোমার আষ্ঠে পিষ্ঠে আলিঙ্গন।

মিস করছি তোমার উষ্ণ কোমল চুম্বন।

তোমার পিঠের লাল তিল, তোমার আঙুলের কাটা দাগ, তোমার গায়ের গন্ধ, তোমার নিশ্বাস- সব সব খুব মিস করছি জান!

আজ ওর জন্যও খুব কষ্ট হচ্ছে! কার কথা বলছি বল তো?

তার কথা বলছি যার কোন নাম নেই! আমরা কোন নাম দেইনি তার! আমরা কোন পরিচয় দেইনি তার! আমরা তাকে পৃথিবীর আলোতে আসতেই দেইনি! আমাদের দু মাসের ভ্রণটাকে গলা টিপে মেরে ফেলেছিলাম।

ইশ আদিত্য! ও যদি এখন থাকতো ওর বয়স এখন পাঁচ হতো না?

ও দেখতে কার মত হতো?

ও থাকলে অমার মৃত্যর পর ও আমার চিহ্ন হয়ে থাকতো..

আদিত্য, আজ একটা গোপন কথা বলি তোমাকে। ওকে জন্ম না দিলেও আমি ওর অস্তিত্ব অস্বীকার করিনি কখনো। এমনকি আমি ওকে একটা নামে ডাকি। ধরে নিয়েছি ও একটা মেয়ে। নাম দিয়েছিলাম ডানা।

অদ্ভুত কি জান, এই চিঠিটি যে নার্স আমার হয়ে তোমাকে লিখছে ওর নামও ডানা! অর্থ ভিন্ন হলেও উচ্চারণে এক।

আদি,

আমার আদিত্য!

আমার একটা কাজ করেবে?

আমাদের শোবার ঘরের কালো আলমারীর উপড়ের বা দিকে বিয়ের শাড়ির বক্সে একটি খাম আছে। অনেকগুলো চিঠি আছে। তোমার লিখা চিঠি । ওগুলো আমার জীবনের প্রিয়তম সম্পদ! ইশ এখন যদি ওগুলো পড়তে পারতাম! তোমার গভীর ভালবাসার অক্ষরগুলো যদি ছুঁতে পারতাম! হয়তো বেঁচে উঠতাম আদিত্য! বিশ্বাস হচ্ছে না? কিন্তু আমার যে আর সময়ই নাই আদিত্য! নিউইয়র্কের সেরা হাসপাতালও আমাকে করোনা থেকে বাঁচাতে পারবে না!

আদিত্য,

তোমার মেঘবালিকা তোমাকে অনেক বড় একটা দ্বায়িত্ব দিতে চায়, বল করবে?

আমার চিঠিগুলো আমার নানাবাড়ীর মাজা পুকুরে ভাসিয়ে দেবে? আমার খুব প্রিয় পুকুর… আমার শৈশবের গন্ধমাখা পুকুর!

আমার কত কত শাড়ি, জামা জুতো আর সাজগোজের নানান জিনিসপত্র এগুলো একটু কষ্ট করে আমি যেখানে যেখানে বলবো সেখানে সেখানে পৌঁছে দেবে?

জামা আর জুতোগুলো দেবে এসিড দগ্ধ মেয়েদের। ওদের নিশ্চয় কেউ ভাল জামা কাপড় দেয় না।

গয়নাগুলো বিক্রি করে কোন এতিম খানার বালিকাদের কানের দুল করে দিও।

সাজগোজের জিনিসপত্রগুলো দেবে তৃতীয় লিঙ্গের ওদের।তাতে খুশিও হবে ওদের কাজেও আসবে।

তুমি বাসাটা বদলে ফেল! আমার জন্যই তো ধানমন্ডি বাসা নেয়া। এখন আর এখানে থাকবার তোমার দরকার কি! তুমি বরং বারিধারায় সুইট দেখে কোন একটা স্টুডিও এপার্টমেন্ট নিয়ে নাও। আমার কেনা সব ফার্নিচার বিক্রি করে দাও!

নতুন বাসার জন্য সিম্পল স্মার্ট অল্প ফার্নিচার কেন। তুমি বুঝেছো আমার কথা, আদি?

কি ভাবছো, আমি তোমার জীবন থেকে আমাকে মুছে ফেলতে বলছি?

না পাগল! মেঘের কথা কি কেউ ভোলে?

তুমি আমাকে তেমন মনে রেখ।

ফুলের সুবাস কে না ভালবাসে, তুমি আমাকে তেমন ভালবেসো!

কিন্তু এসব নিয়ে জীবন কাটানো যায় না আদিত্য, বসবাস করা যায় না। সেজন্য চাই রক্ত মাংসের মানুষ। একটি সংবেদনশীল মন।

কারুকে বন্ধু কর।

ভালবাস।

বিয়ে কর।

সুখে থাক।

তুমি সুখে থাকলে আমার অসময়ে ফুরিয়ে যাবার দুঃখ থাকবে না।

চিঠিটা লেখাতে পেরেই যেন আমার সকল দুঃখ মুছে গেল আদিত্য!

নিজেকে খুব হালকা লাগছে! আমি যেন শুভ্র সফেদ এক সারস পালক!

এখন আমি অনায়াসেই উড়ে যেতে পারি মেঘে মেঘ… …

এই যে আমি উড়ছি!

তুমি ভাল থেক!

ইতি তোমার মেঘবালিকা।

পূর্ববর্তী নিবন্ধপৃথিবী জুড়ে ফ্লয়েডের নিঃশ্বাস
পরবর্তী নিবন্ধঅনুভব: ৩টি কবিতা
ইলোরা লিলিথ। টেলিভিশন নাট্যকার, গল্লেপকার, লেখক, ফ্যাসন ডিজাইনার ও মঞ্চাভিনেত্রী। জন্ম ১৯৭৮ সালের ১৪ই নভেম্বর দিনাজপুর জেলার রাণীসৈংকলে বাবার কর্মস্থলে। বড় হয়েছেন একটি মুক্তমনা সাংস্কৃতিক পরিবেশে। আবৃত্তি, অভিনয়, অনুষ্ঠান উপস্থাপনা, নৃত্য, ছবি আঁকা এসব ছিল তাঁর প্র্যাত্যহিক যাপিত জীবনের অংশ। জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ থেকে নিয়েছেন সম্মান সহ ব্যাচেলর ও মাস্টার্স ডিগ্রি। তের বছরের দীর্ঘ থিয়েটার জীবনে অভিনয় করেছেন ৫০টিরও বেশি মঞ্চ নাটকে। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মঞ্চ নাটকের করেছেন পোশাক পরিকল্পনা। দিয়েছেন নির্দেশনা। বর্তমানে তিনি ‘ফেবরিকা’ ও ‘লিলিথস ফ্যাসন’ নামে দুটি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা-পরিচালক এবং ফ্লাইং পেজেস ওয়েব ম্যাগাজিনের ব্যবস্থপনা সম্পাদক। ২০১২ সালে ইলোরা লিলিথ শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যকার হিসাবে ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড আরটিভি স্টার এওয়ার্ড লাভ করেন।

4 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here