করোনাকাল ২: এক মুঠো চাল

করোনাকালের গল্প, করোনাকাল

স্বাতী নীচের সুবিন্যাস্ত নিম পাতার দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে। অনেকক্ষণ। ওর ক্লান্তি লাগে না। ছয় তলার বাসা থেকে নীচের নিম গাছে গুচ্ছ গুচ্ছ পাতা আলপনায় আঁকা ফুলের মতন লাগে। হালকা বাতাসেই ঝিরঝির কাঁপে সে সবুজ ফুল|

স্বাতী ভাবছিল মন খারাপ করব কি করব না! আজ আমাদের বিয়ের এক বছর। প্রেমের বিয়ে নয়, কিন্তু বিয়েতে প্রেমের কোন কমতি হয়নি। কাল অনেক রাত অবধি জেগে ছিল স্বাতী। ভেবেছিল শেষ মুহূর্তে নোমান মিষ্টি কিছু করবে। কিন্তু… নীচে দূর থেকে একজন খুব চিৎকার করছে। স্বাতী মন স্থির করে শ্রবণ-ইন্দ্রিয়কে সচল করে। মানুষটা একমুঠো চাল সাহায্য চাচ্ছে। কিন্তু চাইবার ধরনে ভিক্ষুক মনে হচ্ছে না। স্বাতী ভাবল দড়ির সাথে বেঁধে কিছু চাল ডাল দেয়া যাক। সে প্রায় দৌড়ে রান্নাঘরে আসে। শাশুমা রান্নায় ব্যাস্ত।

মা, একটা লোক নিচে থেকে সাহায্য চাচ্ছে। মনে হয় না ভিক্ষুক।

আহারে! কত মানুষ যে না খায়া মরবে রে মা… তুমি একটু জিরাটা গুড়া করতে পারবা? আমি ভাইজা রাখছি।

জ্বী মা।

স্বাতী পাথরের বাটিতে ছোট্ট নোড়া ঘুড়িয়ে ঘুড়িয়ে জিরা পেষে। কি মিষ্টি সুগন্ধ! জিরার গন্ধ কি ক্ষুধা বাড়ায়। যোহরের আজান এখনো দেয়নি তবু হঠাৎ ক্ষুধা পেয়ে গেল। নিচের অভাবী মানুষটি এখনো চিৎকার করে সাহায্য চাইছে। স্বাতী গভীরভাবে পরখ করে শাশুমার অবয়ব। দেখে কিছু বোঝা যাচ্ছে না, তিনি অভাবী লোকটিকে সাহায্য করবেন কি করবেন না। আবার কি জিজ্ঞেস করব? স্বাতী দ্বিধান্বিত। ওর মনের ব্যাকুল কথাটা মুখে স্পষ্ট ফোটে না…

মা! .. নিচে… ওই –

করোনাকালের আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন : করোনাকাল ৪: আফরোজা

শোন স্বাতী, মাংসটা দুপুরে টেবিলে দিও না। রাতে দিও। এখন শুধু ছোট মাছই খাক। ডাল টাল তো আছেই, না? যে দিন পড়লো! কোনকিছুর ঠিক নাই… একটু হিসাব কইরাই চলতে হবে।

জ্বী মা!

স্বাতীর সম্মতীর প্রয়োজন ছিল না। শাশুমা তার জবাবের জন্য প্রশ্ন রাখেনওনি। স্বাতী হ্যাঙ্গারে কাপড়ের মতন ঝুলে রইল। হঠাৎ ভেতর থেকে নোমান স্বাতী স্বাতী বলে চিৎকার করে।

যাও নোমান ডাকছে। নিশ্চয় টাওয়াল নিতে ভুলে গেছে। ও আর ঠিক হলো না।

স্বাতী ‘জ্বী’ সুলভ মাথা কাত করে ছোট ছোট পা ফেলে নিজেদের শোবার ঘরে আসে। নোমান ওয়াশরুমের দরজাটা একটুখানি ফাঁকা করে ভেজা গায়ে দাঁড়িয়ে। স্বাতী রকিং চেয়ারে ঝুলিয়ে রাখা টাওয়াল ট্রাউজার নিয়ে নোমানকে দেয়।

এই সতী! এই যে সতী!

নোমান প্লিজ আমাকে “সতী” ডাকবে না!

কেন, আমি তোমার কোন নাম রাখতে পারি না?

করোনাকালের আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন : করোনাকাল-১ : শুভ নববর্ষ

নিশ্চয় পার। কিন্তু সেটা আমার নামের চাইতে সুন্দর তো হতে হবে, না?

স্বাতীর চাইতে “সতী” অনেক বেশি সুন্দর!

মোটেও না। প্রথমত সতী কনসেপ্টটাতেই আমার প্রবল আপত্তি আছে –

এই এক তোমাদের মফস্বলীয় সমস্যা! মডার্ন হইতে চাও তো নারীবাদী হও।

আচ্ছা! আর শহুরেরা? মডার্ন হতে চাও তো দেশের সব কিছুকে তাচ্ছিল্য কর!

ফালতু কথা বলবে না!

আচ্ছা বলবো না। তুমি গোসল শেষ কর। ঠাণ্ডা লাগবে।

করোনাকাল- ১

করোনাকালের গল্প, করোনাকাল

নোমানকে আর কথা না বাড়াতে দিয়ে স্বাতী বারান্দায় চলে আসে। এই এক খেলা শুরু হয়েছে নোমানের। যেদিনই ইন্টিমেট হতে চায় কিছু একটা বলে তার রাগ ওঠায়। তারপর সে রাগ ভাঙাবার ছুঁতোয় আদরে আদরে পাগল করে দেয়। কিন্তু একটু আগের ভাবনাটাই আবার স্বাতীর মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল। নোমানের সাথে অভিমান করব কি করব না। আজ আমাদের বিয়ের এক বছর। গতরাতে নোমান মুখে অন্তত হ্যাপি এ্যানিভারসারি বলতে পারতো। এই বিশ্ব মহামারিতে কে তার কাছে শাড়ি গয়না চাচ্ছে! রাগে অভিমানে কোমল মুখটা শক্ত হয়ে ওঠে স্বাতীর। মায়ের উপদেশ মনে পড়ে, রাগ কমাতে মাটিতে তাকাতে হয়। নীচে তাকাতেই প্রিয় নিম গাছ। তারও নীচে একজন শীর্ণ জরাজীর্ণ মানুষ। হয়তো কাঁদছেন। হঠাৎই উপড়ে তাকালে স্বাতীকে দেখতে পান। তড়িৎ উঠে দাঁড়ান।

করোনাকালের আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন : করোনাকাল ৩: সঙ্গনিরোধ

আল্লাহ! মা মা গো! একটু সাহায্য প্রয়োজন! আমার বাচ্চাগুলা না খায়া মইরা যাইবো! কোথায়ও সাহায্য পাই নাই মা! বিশ্বাস করেন!

বিশ্বাস করি বিশ্বাস করি বাবা! স্বাতীর বুকের ভেতরটা যেন দুমরে মুচরে ওঠে। মন স্থির করে, সে শাশুমাকে বলবে, ঘরে যা আছে তা থেকেই কিছু দিতে।

শশুরবাবাকে ভাত বেড়ে দিচ্ছেন শ্বাশুমা।

এমনিই তো ঢাকা শহরে একজনের আয়ে সংসার চলে না। তার উপড় ‌এপ্রিল মাসের বেতন দিবে না। মে মাসেও যদি লকডাউন থাকে? তাহলে আমরা খাব কি? আমরা তো আর রিলিফ চাইতে পারব না?

নোমানকে খেতে ডাক। খেয়ে নাও। আমি পরে খাব।

আমিও পরে খাব মা।

কেন নোমানের সাথে বসে খাও।

না মা, আমার পেটের মধ্যে কেমন করছে! একটু শুয়ে থাকি?

করোনাকালের আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন : করোনাকাল ৫: দিদিমা

আচ্ছা। একটু খেলেই তো মনেহয় ভালো লাগত মা…

খাব মা, একটু পরে খাই?

আচ্ছা আচ্ছা মা যাও রেস্ট নাও।

নোমানকে খেতে পাঠিয়ে স্বাতী সত্যিই বিছানায় যায়। কেমন ক্লান্ত লাগছে। মানুষটা কি এখনো আছে, না চলে গেছে? থাক্। ভেবে আর লাভ কি! সমস্ত ব্যাপারটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে চায় স্বাতী।

অনার্স পরীক্ষা দিয়েই দুম করে বিয়ে হয়ে গেল। কথা ছিলো ঢাকা এসে মাস্টার্স পড়ব। কেমন কেমন করে যেন এক বছর পেরিয়ে গেল ভর্তি হওয়া হল না। স্বাতীর খুব ইচ্ছে ছিল কলেজে পড়াবে। বিয়ের আগে দুটো টিওশনি করত। এটা সেটা খরচের জন্য কারো কাছে টাকা চাইতে হত না। ইশ্ আমার যদি একটা চাকরি থাকত। স্বাতীর বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরয়। মানুষটির কণ্ঠ যে আর শোনাই যায় না? স্বাতী উঠে বারান্দায় আসে।

নিম গাছের নীচে মানুষটি আর নেই। যেন কি ভীষণ শূণ্য হয়ে গেছে জায়গাটা। যেন আপন কেউ ঘর ছেড়ে চলে গেছে। এতক্ষণের অপরাগতার অবদমিত কষ্টটা এবার বাঁধ ভেঙে নামে। স্বাতী জানে না এ অশ্রু কার জন্য। ঐ মানুষটির জন্য না নিজের জন্য!

* করোনাকাল

পূর্ববর্তী নিবন্ধকরোনাকাল-১ : শুভ নববর্ষ
পরবর্তী নিবন্ধকরোনাকাল ৩: সঙ্গনিরোধ
ইলোরা লিলিথ। টেলিভিশন নাট্যকার, গল্লেপকার, লেখক, ফ্যাসন ডিজাইনার ও মঞ্চাভিনেত্রী। জন্ম ১৯৭৮ সালের ১৪ই নভেম্বর দিনাজপুর জেলার রাণীসৈংকলে বাবার কর্মস্থলে। বড় হয়েছেন একটি মুক্তমনা সাংস্কৃতিক পরিবেশে। আবৃত্তি, অভিনয়, অনুষ্ঠান উপস্থাপনা, নৃত্য, ছবি আঁকা এসব ছিল তাঁর প্র্যাত্যহিক যাপিত জীবনের অংশ। জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ থেকে নিয়েছেন সম্মান সহ ব্যাচেলর ও মাস্টার্স ডিগ্রি। তের বছরের দীর্ঘ থিয়েটার জীবনে অভিনয় করেছেন ৫০টিরও বেশি মঞ্চ নাটকে। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মঞ্চ নাটকের করেছেন পোশাক পরিকল্পনা। দিয়েছেন নির্দেশনা। বর্তমানে তিনি ‘ফেবরিকা’ ও ‘লিলিথস ফ্যাসন’ নামে দুটি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা-পরিচালক এবং ফ্লাইং পেজেস ওয়েব ম্যাগাজিনের ব্যবস্থপনা সম্পাদক। ২০১২ সালে ইলোরা লিলিথ শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যকার হিসাবে ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড আরটিভি স্টার এওয়ার্ড লাভ করেন।

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here