করোনাকাল ৩: সঙ্গনিরোধ

করোনাকাল শিরোনামে প্রকাশিত ইলোরা লিলিথের গল্পের প্রচ্ছদ ছবি এটি।

বাইরে থেকে দরজা খুলে থমথমে মুখে রিভা ভেতরে প্রবেশ করে। আতিক মুহূর্তেই সব বুঝে নেয়। সে স্বাভাবিক হবার প্রাণপণ চেষ্টা করে।

তুমি সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নাও! কাপড় ছেড়ে শাওয়ার নাও!

এসব করে আর কি হবে!

আরে আমার হয়েছে বলে তোমরও হবেই এমন তো নয়। শোন, আমি জানতাম আমার রিপোর্ট পজিটিভ আসবে। কারণ আমার যে জ্বর এর সাথে সারা জীবনের জ্বরের কোন মিল নেই। এই দেখ চামড়ার নিচটা যেন পুড়ে পুড়ে যায়। যাই হোক আশা করি ভালো হয়ে যাবে। তুমি চিন্তা কর না। আমি সব প্লান করেছি। আমি আমার লিখার ঘরে থাকব। তুমি আমার জন্য কিছু রান্না করে খাবার টেবিলে রেখে দেব। আমার খুব খারাপ লাগলে তোমাকে বলব। আমার এক বন্ধুকে বলেছি ও তোমার জন্য কয়েকটি পিপিই পাঠিয়ে দেবে।

সেই বন্ধুটি কি এলিটা? আর আমার কেন পিপিই লাগবে, আমি কি ডাক্তার, না নার্স?

না, কিন্তু তুমি কি অরক্ষিত অবস্থায় আমার কাছে আসবে না কি?

হাহ্ অরক্ষিত! বটেই! কিন্তু মজা কি জানো, গত তিন বছর ধরেই তো আমি অরক্ষিত রয়েছি। এলিটা সোনাটা টিউলিপ টুম্পা!… আমার কোন পিপিই লাগবে না। ঐ সব এককোষী অণুজীব করোনা-ফরোনা অমার কিছু করতে পারবে না।

রিভা! তোমার মাথা ঠিক আছে? আমি ইনফেক্টেড, তুমি নও। আমি মারা যেতে পারি তুমি নও। য়্যু আর নট ইনফেক্টেড ইয়েট…

নট ইয়েট, বাট নট নেভার! যখন তখন হতে পারে আমারও। কিন্তু হ্যাঁ, স্বীকার করছি এই মুহূর্তে আমার মাথা ঠিক নাই। তবে সেটা করোনা হয়ে মরে যাবার ভয়ে নয়। কেন জানো? আসো তোমাকে বানান করে বলিঃ তুমি, তুমি কোন আহ্লাদে নুয়্যর্ক ঘুরে আসা এলিটার কাছে গেছিলে? ভাইরাসটাতো ভালোবেসে ওর কাছ থেকে নিয়ে এসেছো, না? চেহারা ওরকম বানাচ্ছো কেন?

বমি আসছে..

আমার কথায় তোমার বমি আসছে!

তুমি অন্ধ হয়ে গেছ! কি কুৎসিত তুমি রিভা! অমি রুমে গেলাম। তুমি আর আমার কাছে এস না।

আতিক বমি আর কাশি আটকাতে আটকাতে যন্ত্রণায় কুকড়ে যাওয়া শরীরটা টেনে হিচরে লিখাঘরের দিকে এগিয়ে যায়।

রিভা দুহাতে মাথা চেপে ধরে। কি বলল এটা আতিক! কি বলল এটা! কত বড় সাহস! রিভা বিরবির করে। ওর মনে হয় ছুটে গিয়ে খুন করে আতিককে। উঃ মাথাটা ছিঁড়ে যাচ্ছে! কেন চলে গেল আতিক। কথা তো শেষ হয়নি। দ্রুত সে আতিকের দরজায় যায়। যেন মনের সব গরল এখুনি বের করে দেবে। আতিক আতিক বলে বারকয়েক ডাকে। কোন সারা নেই । হয়তো ওয়শরুমে, রিভা ভাবে। হঠাৎ ওর চিন্তা হয় বমির পর একটু খাওয়ার পানি লাগে, আতিকের হাতের কাছে আছে তো? আতিক আতিক! কোন সাড়া নেই।

ইশ্! মুখটা যদি চেপে ধরতে পারতাম। কেন এত কথা বললাম! খুব কান্না পায় আতিকের জন্য। রিভা রান্নাঘরে যায়। ফ্রিজ থেকে চিকেন বের করে। গরম গরম স্যুপ নিশ্চয়ই ওর ভালো লাগবে, রিভা ভাবে।

করোনাকাল, গল্প-৩

অতিক ওয়াশ রুম থেকে বের হয়। ক্লান্ত কিন্তু খানিকটা সুস্থ। হাত মুখ মুছে ফ্লাস্ক থেকে কফি ঢালে। কফির সুবাসেই যেন ক্লান্তি উড়ে যায। ল্যাপিটা অন করে। এফবি খোলে। রিভা অন লাইনে নেই। কাশিটা কমছে না। কাশিটা ছাড়া অন্য কষ্টগুলো সহ্য করে নিত আতিক। কষ্ক-ক্লিষ্ট জীবন তার। এফবি’তে দেয়া রিভার প্রোফাইল পিকটা আতিকের তোলা। এত সুন্দর রিভাকে খুব কম ছবিই ধারণ করেছে। বুদ্ধিদীপ্ত, সংবেদনশীল হৃদয়বান। আতিক নিবিষ্ট মুগ্ধতায় মুহূর্তকাল করোনার প্রকোপ ভুলে থাকে। মহাকালের সেই থমকে থাকা সময়ে আতিক কাগজ কলম নিয়ে বসে।

পাগলি!

পাগল আমার! খুব ভয় পেয়েছো? ভয় পেয়ো না। আমার কিছু হবে না। তোমারও আমি কিছু হতে দেব না।

রিভা কেন ভুল বুঝছ আমাকে? বিশ্বাস কর, আমি এলিটার কাছে যাইনি। যে ম্যাসেজটা দেখে সেদিন আমার মোবাইলটা ছুড়ে ভাঙলে ঐ ম্যাসেজটা একটা কথার কথা ছিল মাত্র। আচ্ছা তুমি হিসেব করে বলতে পারবে আমাকে কতবার ভুল বুঝেছো? মনে আছে একবার আমার উপন্যাসের নায়িকা তন্দ্রাকে নিয়ে কি না কি করলে! অথচ তোমার কাজিনের বউ তন্দ্রকে আমি কখনো দেখিনি পর্যন্ত। আমার কল্পনার সাথে তোমার ভাবী মিলে গিয়েছিল কেবল। সেবার তিন দিন তুমি আমাকে তোমার কাছে যেতে দাওনি। উফ রিভা, এখন তোমাকে ছাড়া চৌদ্দদিন কিভাবে থাকব! তবে তুমি আমাকে এর চাইতেও লম্বা বিরহে রেখেছিলে একবার। প্রায় দুই মাস আমাকে ফেলে রেখে গিয়েছিলে। তখন খুব জ্বর হয় আমার। আমি নিশ্চিত আমাকে তুমি ছেড়ে না গেলে ঐ চিকুনগুণিয়া জ্বর আমার হত না। অবশ্য জ্বরের খবর পেয়েই তুমি কাঁদতে কাঁদতে উপস্থিত। আমি জানি আজও তুমি যা কিছু বলছ…

লিখা ফেলে আবারও ওয়াশ রুমে ছুটতে হয় আতিককে।

ক্ষুধা তৃষ্ণা সব গেছে। মনের মধ্যে হিমালয়ের ভার। আতিকের জন্য খাবার তৈরী করে রিভা। টেবিলে খাবার ঔষধ রাখতেই দেখে একটি সাদা ভাজ করা কাগজ। খুলতেই যেন সমস্ত পৃথিবী টলে ওঠে ।

You are heartlees.. such a bullshit!

সাদা কাগজে লিখা ছোট অক্ষরগুলি যেন কাগজ ছেড়ে রিভার চারপাশে চক্রাকারে ঘুরতে থাকে। যেন কোন আসুরিক সুরে উচ্চারিত হয় সে কথাগুলো। বারবার।

ইয়েস আই এ্যম বুলশিট! হার্টলেস!

আমি হার্টলেস, না? ঠিকই তো, আমি হার্টলেস! ঠিক বলেছ। আমি হার্টলেস না হলে অসুস্থ মাকে বাড়িতে রেখে তোমার হাত ধরে পালিয়ে আসি! আমি হার্টলেস না হলে মোটা মাইনের চাকরি করা মেয়ে হয়ে স্বল্প আয়ের পিতাকে ফেলে চলে আসি! আমি হার্টলেস না হলে যেখানে নিশ্চিত জানি চলে আসলে ছোট ছোট দুই ভাই বোনের পড়াশুনার কত ক্ষতি হবে, তবু চলে আসি! আমিই তো হার্টলেস শুধু নিজের সুখের চিন্তা করে তোমার মতন ভ্যাবাগন্ডার কাছে চলে আসি! আমি হার্টলেস না হলে তোমার মতন খুনীপুত্রর জন্য পাগল হই! ইয়েস আমি হার্টলেস তোমার লেখক হবার খায়েশ পুরা করতে রাতদিন আমি একাই সংসারটা চালাই। ইয়েস আমি হার্টলেস তুমি বাবা হবার জন্য প্রস্তুত নও বলে আমি আমার ভ্রণ নষ্ট করি।

– এতখানি একটানে লিখে থামে রিভা। কেন লিখছে! কি লাভ! নিজের উপরেই প্রচন্ড ঘৃণা হয় রিভার।

প্রচণ জ্বর, শ্বাসকষ্ট নিয়ে আতিক নিজের ঘর থেকে বের হয়। হাতে খালি ফ্লাস্ক। বের হতেই দেখে খাবার টেবিলে পরিপাটি করে খাবার ঔষধ, পানি সাজিয়ে রাখা। একপাশে একটি ভাজ করা কাগজ। কাঁপা হাতে খোলে আতিক। ছোট্ট একটি চিঠি। এক পলকেই পাঠ করা যায়। তবু আতিক সে চিঠির দিকে নির্ণিমেষ তাকিয়ে থাকে। জ্বরে লাল হয়ে যাওয়া চোখ দিয়ে জোৎস্না ধারার মতন অশ্রু গড়ায়। মনে মনে বারবার আতিক উচ্চারণ করে সে চিঠির লাইন।

I’m sorry! I’m so sorry !!! Love you….

পূর্ববর্তী নিবন্ধকরোনাকাল ২: এক মুঠো চাল
পরবর্তী নিবন্ধকরোনাকাল ৫: দিদিমা
ইলোরা লিলিথ। টেলিভিশন নাট্যকার, গল্লেপকার, লেখক, ফ্যাসন ডিজাইনার ও মঞ্চাভিনেত্রী। জন্ম ১৯৭৮ সালের ১৪ই নভেম্বর দিনাজপুর জেলার রাণীসৈংকলে বাবার কর্মস্থলে। বড় হয়েছেন একটি মুক্তমনা সাংস্কৃতিক পরিবেশে। আবৃত্তি, অভিনয়, অনুষ্ঠান উপস্থাপনা, নৃত্য, ছবি আঁকা এসব ছিল তাঁর প্র্যাত্যহিক যাপিত জীবনের অংশ। জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ থেকে নিয়েছেন সম্মান সহ ব্যাচেলর ও মাস্টার্স ডিগ্রি। তের বছরের দীর্ঘ থিয়েটার জীবনে অভিনয় করেছেন ৫০টিরও বেশি মঞ্চ নাটকে। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মঞ্চ নাটকের করেছেন পোশাক পরিকল্পনা। দিয়েছেন নির্দেশনা। বর্তমানে তিনি ‘ফেবরিকা’ ও ‘লিলিথস ফ্যাসন’ নামে দুটি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা-পরিচালক এবং ফ্লাইং পেজেস ওয়েব ম্যাগাজিনের ব্যবস্থপনা সম্পাদক। ২০১২ সালে ইলোরা লিলিথ শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যকার হিসাবে ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড আরটিভি স্টার এওয়ার্ড লাভ করেন।

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here