কিভাবে করোনাভাইরাস আক্রান্তের সংখ্যা নামিয়ে আনল দক্ষিণ কোরিয়া

করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে পৃথিবীর অন্য সকল দেশ থেকে একটি দেশের চিত্র স্পষ্টতই ভিন্ন: দক্ষিণ কোরিয়া। উইকি পিডিয়ায় প্রকাশিত উপরের ছকটি লক্ষ করুন। সত্যিই তাই, নয় কি?

লক্ষ্য করুন, ফেব্রুয়ারির শেষদিক থেকে মার্চের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে হু হু করে। এক থেকে দশ, দশ থেকে শত, তারপর শত থেকে হাজার। ২৯ ফেব্রুয়ারি শুধু মাত্র একদিনে আক্রান্ত হয়েছে ৯০৯ জন। বলা হয়েছিল দেশটির পাঁচ কোটি লোক স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে চলে এসেছে। কিন্তু পরবর্তী এক সপ্তাহের কম সময়ের মধ্যেই করোনা আক্রান্তের সংখ্যা অর্ধেকে নেমে আসে। তার পরের ৪ দিনের মাথায় এই সংখ্যা নেমে আসে তারও অর্ধেকে।

গতকাল সোমবার দক্ষিণ কোরিয়ায় মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন ৬৪ জন নতুন আক্রান্তের ঘটনা ঘটে। একই দিন ইউরোপের আক্রান্ত দেশ ইতালি, স্পেন, জার্মানি, ফ্রান্স, ‍সুইজারল্যান্ডে এই সংখ্যা এক থেকে ছয় হাজার পর্যন্ত । যুক্তরাষ্ট্রে তা ১০১৬৮। মৃত্যুর সংখ্যার দিক থেকেও এই প্রকট পার্থক্য লক্ষণীয়। ইউরোপ-আমেরিকার স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে গুড়িয়ে দিয়ে প্রতিদিন ‍মৃত্যুর সংখ্যা যেখানে শ’য়ের কোঠাকে ছাড়িয়ে ছুঁতে চলেছে হাজারের ঘর সেখানে গত সোমবার দক্ষিণ কোরিয়ার মৃত্যুসংখ্যা মাত্র ৭।

বৃহৎ পরিসরে আক্রান্ত দেশগুলোর মধ্যে চীনের পর কেবলমাত্র দক্ষিণ কোরিয়াই অল্প সময়ের মধ্যে করোনাভাইরাস আক্রমণের ব্যাপকতা রোধে বড় সফলতা দেখাতে সমর্থ হল। চীনের কথা যদি ধরা হয়, এক দলীয় শাসন ব্যবস্থা থেকে তারা বেশ কিছু সুবিধা নিতে পেরেছিল। কঠোর আইনী ব্যবস্থা, মতভিন্নতার সীমাবদ্ধতা, দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা মানুষের সামাজিক ও মানসিক গঠন চীনকে আগ্রাসী ব্যবস্থা, পশ্চিমাদের ভাষায় ক্রেজি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সুবিধা দিয়েছিল। তারা ’লকডাউন’ বলে একটা নতুন ধারণার জন্ম দিয়ে র্পৃথিবীর সর্ববৃহৎ জনগোষ্ঠিকে বিশেষ জনশৃঙ্খলায় প্রাণবিনাশী করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণ করে। এ নিয়ে চীন নানা দিক থেকে বিশেষ করে পশ্চিমা বিশ্লেষকদের সমালোচনার মুখে পড়ে। চীনের সামনে আর কোনো বিকল্প ছিল কিনা তা নিয়ে তর্ক হতে পারে, কিন্তু চীন এবং সারা পৃথিবীর সাধারণ মানুষ এটাকে সাফল্য হিসাবেই দেখছে।

কিছু বিকল্প চেষ্টার পর সারা পৃথিবী, এমন কি, চীনের কট্টর সমালোচক দেশগুলোও চীনের দেখানো পথেই হাঁটতে শুরু করছে। বিশ্বজুড়ে দেশে দেশে, শহরে শহরে শুরু হয়েছে লকডাউন। তাতেও কি থামানো যাচ্ছে মৃত্যুর মিছিল? পরিসংখ্যান বলছে, না। দেখতে দেখতে করোনা আক্রান্ত মৃত্যুর সংখ্যা ২০ হাজার ছুঁয়েছে। তবে চীনের দেখানো পথে না হেঁটেও সাফল্য দেখাচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়া। বিশ্বব্যাপী সংক্রমণ ব্যাধি বিশেষজ্ঞদের তীক্ষ্ণ নজর এখন তাই দক্ষিণ কোরিয়ার দিকে। চুলচেরা বিশ্লেষণ করে তারা দেখছে তাদের গৃহীত পদক্ষেপ গুলো।

কি পেয়েছেন বিশ্লেষকরা দক্ষিণ কোরিয়ার নেয়া পদক্ষেপগুলো বিশ্লেষণ করে? তার একটা ধারাবাহিক বিবরণ নিচে তুলে ধরা হল।

এক. সংক্রমণ ছড়াবার আগেই রুখে দাঁড়াও

জানুয়ারির শেষ দিকে প্রথম আক্রান্তের ঘটনা ধরা পড়ার এক সপ্তাহের মধ্যে সরকার ওষুধ ও চিকিৎসা সামগ্রী উৎপাদকদের সাথে বসে। আহ্বান জানায় দ্রুততম সময়ের মধ্যে টেস্টিং কিট তৈরির গবেষণা শুরুর। প্রতিশ্রুতি দেয়, কেউ তা বের করতে পারলে দ্রুততম সময়ের দেয়া হবে বাণিজ্যিক উৎপাদনের অনুমোদন।

এর পরের দ্বিতীয় সপ্তাহ নাগাদ আক্রান্ত রোগির সংখ্যা শ’ পেরুবার আগেই তারা টেস্টিং কিট উৎপাদনে চলে যেতে সক্ষম হয় এবং প্রতিদিন হাজারে হাজারে কিট সরবরাহ করতে থাকে। বর্তমানে তাদের দৈনিক উৎপাদনের পরিমাণ এক লক্ষেরও বেশি। নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে এখন তা তারা বাইরে রপ্তানী করছে।

দুই. নিরাপদে যত আগে পারা যায় টেস্ট কর

তারা টেস্ট করেছে দ্রুততম সময়ে, যত বেশি পেরেছে। তারা চেষ্টা করেছে যাতা রোগের প্রাথমিক পর্যায়েই রোগিকে সনাক্ত করা যায়। তাতে দুটি সুবিধা। এক. রোগের প্রাথমিক অবস্থাতেই চিকিৎসা শুরু করা গেল, দুই. সুস্থ মানুষ থেকে আক্রান্ত ব্যক্তিকে আলাদা করে সংক্রমণের বিস্তার রোধ করা গেল। এরই মধ্যে তারা ৩ লক্ষেরও বেশি টেস্ট সম্পন্ন করেছে। জনসংখ্যার আনুপাতিক হিসাবে এটা যুক্তরাষ্ট্রে করা টেস্ট সংখ্যার ৪০ গুণ।

তিন. যোগসূত্র বের কর, পৃথক কর আর নজরদারিতে আনো

টেস্টের মাধ্যমে যখনই একজন রোগিকে সনাক্ত করা গেল, এবার কাজ হল তাঁর সামম্প্রতিক চলাচলের ও মেলামেশার সূত্র খুঁজে বের করা। যাদের সাথে সে মেলামেশা করেছে তাদেরকে সাধারণ মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন করা, প্রয়োজনে অন্তরীণ করা আর পরিপূর্ণ নজরদারিতে রাখা। চীনাদের মত কোরিয়ানরাও এ কাজে বলা যায় শতভাগ সফল হয়েছে। ফলে তারা দ্বিতীয় বা তৃতীয় পর্যায়ের আক্রান্তকেও সনাক্ত করে চিকিৎসা ও বিচ্ছিন্নতার আওতায় নিয়ে আসতে পেরেছে।

গণ-সহযোগিতাকে সংযুক্ত কর

স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা বা তাপ নীরিক্ষার স্ক্যানার সংখ্যা বেশি নাই তো কি করা, জনগণকে সম্পৃক্ত কর। তাদেরকে আহ্বান জানাও। সবসময়ই তাদের পরীক্ষা গ্রহণের পরিস্থিতি ও সময় সম্পর্কে জানাও। জনগণকে সবসময় আস্থায় রাখো। অবিরাম তাদের সাহায্য করার জন্য অনুরোধ করতে থাকো।

যত বেশি তুমি জনগণকে তোমার সাথে রাখতে পারবে তত কম ছড়াবে পেনিক, আতঙ্ক। তত বেশি করেই নজর দেয়া যাবে যুদ্ধটাকে সংহত করার ‍দিকে। তবেই তুমি করতে পার জয়ের আশা।

এই চারটি মূল নীতির উপর ভিত্তি করেই দক্ষিণ কোরিয়া সর্বনাশা করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে। আর এখন পর্যন্ত সেই নীতিই বজায় রেখেছে।

তাদের সাফল্য এখন দৃশ্যমান।

কিন্তু তাদেরকে অনুকরণ করবার সময় এবং সম্ভাবনা আক্রান্ত প্রায় প্রতিটা দেশই তড়িৎ সিদ্ধান্ত নেবার অক্ষমতার কারণে হারিয়ে ফেলেছে।

পরবর্তী নিবন্ধকরোনাকাল-১ : শুভ নববর্ষ
মোসাদ্দেক মিল্লাত। বাবার চাকরীসূত্রে জন্ম নেত্রকোণার মোহনগঞ্জে। পিতৃআবাস ফরিদপুরের নগরকান্দায়। শৈশব ও কৈশোর কেটেছে কিশোরগঞ্জে। এখানে গুরুদয়াল কলেজে পড়ার সময় সম্পাদনা করতেন লিটিল ম্যাগ ’পরিচিতি’। জড়িত ছিলেন বিভিন্ন সংগঠনে। সার্বক্ষণিক কর্মী হিসেবে কাজ করেছেন বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারে। সম্পাদনা করেছেন ’গ্রাম থিয়েটার’ পত্রিকা।

2 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here