লেন্ডার আর হিরো: চিরন্তন প্রেমের গল্প ১

গল্পটি পড়তে সময় লাগতে পারে ১৪ মিনিট। পাঠ শুনুন: ১৬ মিনিট ৪৪ সেকেণ্ড

তুরস্কের এশিয়ান আর ইউরোপিয়ান অংশকে ভাগ করে আছে যে জলরাশি তার আদি নাম হেলেসপন্ট। তার দুই পাড়ে ছিল দুটি সমৃদ্ধ জনপদ। সেস্টস আর এবিডস।

সেস্টসে, হেলেসপন্টের তীর ঘেঁষে আফ্রোদিতির মন্দির।

প্রেম আর সৌন্দর্য, আনন্দ আর হৃদয়াবেগ, সর্বোপরি জননক্রিয়ার দেবী আফ্রোদিতি

সেই মন্দিরের পূজারিণী হিরো। সৌন্দর্য তার তুলনাহীন। নয়নাভিরাম তার রুপেরর যাদু ছাড়িয়েছিল মর্তের সীমানা। মুগ্ধ করেছিল স্বর্গের দেবতাদেরও।

খ্যাতি যে শুধু তার সৌন্দর্যেরই ছিল তা নয়। তার উদ্ভিন্না যৌবনের মাদকতাও ঘুরে বেড়াত বাতাসে বাতাসে। দূর-দূরান্ত থেকে মধুলোভী পতঙ্গের মতো আসত যুবকেরা। আর প্রত্যাখ্যানের আগুনে জ্বলে-পুড়ে হতো ছাই।

জনশ্রুতি আছে, দেবরাজ এ্যাপেলো হিরোর শুধুমাত্র চুলের স্পর্শ পাবার জন্য তার সিংহাসন পর্যন্ত উপহার দিতে প্রস্তুত ছিলেন।

This picture shows the location of Sestos and Abidos on the bank of Helesponto- Dardanelos. This is now the part of Classic Love story 'Hero and Leander- লেন্ডার আর  হিরো: এক চিরন্তন প্রেমের গল্প.
লেন্ডার আর হিরো: এক চিরন্তন প্রেমের গল্প: ম্যাপ- হেলেসপন্ট

প্রতি বছরই পালা পার্বণে হেলেসপন্টের উত্তাল জলরাশি পেরিয়ে এবিডসের যুবকরাও আসত হিরোর কাছে প্রেম নিবেদন করতে। ব্যতিক্রম ছিল শুধু একজন। তার নাম লেন্ডার।

লেন্ডার- সুঠাম, সুন্দর, শক্তিশালী। পেশল বাহু। দীর্ঘাকায়। বুদ্ধিদীপ্ত দ্যুতিময় তার দুটি চোখ।

সে যখন তাকায়, তার সে দুটি চোখ কথা বলে। সে যখন কথা বলে, তখন তার দুটি ঠোঁট হাসে। আর সে যখন চুপ থাকে, তখন তার সেই দুটি পুরুষ্ট ঠোঁট যেন সুন্দরীদের চুমু খাবার জন্যই প্রস্তুত হয়ে থাকে।

হিরোর রূপের গুণগান শুনতে শুনতে লেন্ডারের মনে প্রেম যতটুকু না-জাগে, তার চেয়ে বেশি জাগে ক্ষোভ।

সৌন্দর্যের এত অহঙ্কার? কোনাে পুরুষই কি তার যোগ্য নয়?

আফ্রোদিতির মন্দিরে প্রেম উৎসব

বছর ঘুরে আফ্রোদিতির মন্দিরে বড় উৎসবের দিন ঘনিয়ে আসে আবার। প্রতি বছরের মত এবারও সম্ভ্রান্ত সব যুবকেরা প্রেমাস্পদকে লাভ করার আশায় সেস্টসে ভিড় করতে থাকে। বন্ধু-বান্ধবদের পীড়াপীড়িতে লেন্ডারও হেলেসপন্ট পাড়ি দিয়ে উপস্থিত হয় সেস্টসে।

সেস্টসে, দিনভর, বড় রাস্তায় যুবকেরা ঝাঁক ঝাঁক তারকার মত সুন্দরীদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য প্রদক্ষিণ করে বেড়ায়। কিন্তু সে রাস্তার ধারেও যায় না লেন্ডার। বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গ ছেড়ে একা, মন্দিরের এপাশে ‍ওপাশে ঘুরে ফেরে।

[আরো পড়তে পারেন: পূর্বক্ষণ ]

উৎসবে-আনন্দে ধীরে ধীরে সূর্য পশ্চিমে হেলে পড়ে। লেন্ডার তখন মন্দির-দেয়ালের বাইরে, খোলা চত্বরে। যাদুর খেলা ঘিরে বেশ বড় একটা জটলা সেখানে। খানিক দূরে, তার মুখোমুখি মন্দিরে প্রবেশের সোপানমালা। এই পথ বেয়ে বেশ খানিকটা উপরে উঠে, তবে নামতে হয় মন্দিরের ভেতর।

সেদিকে তাকিয়ে লেন্ডার হয়তো মন্দিরে প্রবেশের কথাই ভাবছিল।

প্রথম দেখার প্রেম: এক অচেনা নারী

লেন্ডারের ভাবনায় ছেদ টেনে মন্দিরের ভেতর দিক থেকে একজন নারী ধীরে ধীরে উদিত হয় সোপানচূড়ার বেদির উপর।

পড়ন্ত সূর্যের লালিমা মাখা নরম আলো এসে পড়ে তার মুখের উপর। আর তার প্রতিফলিত দ্যুতি ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে।

এই কি তবে সেই? জগৎখ্যাত সুন্দরী, মন্দির পূজারিণী হিরো?

হোক সে, বা না হোক, লেন্ডারের মনে হয়, মন্দির ফটকের সুউচ্চ বেদিতে দাঁড়ানো সূর্য দেবতার আশীর্বাদ পাওয়া এই দেবীর জন্যই সে সারাটা দিন ‍ঘুরে বেড়িয়েছে।

তার মুগ্ধ দু’চোখ দ্যুতি ছড়ানো সেই মুখের উপর বিদ্ধ হয়ে থাকে।

হঠাৎ তার মনে হয়, এই বুঝি সে পা বাড়িয়ে হারিয়ে যাবে উৎসবের ভিড়ে।

কি করবে লেন্ডার?

নিজেকে আর সামলাতে পারে না সে। মন্ত্রমুগ্ধের মতো সোপান বেয়ে উপরে উঠে যায়। তার সামনে এসে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ে। উর্ধ্বমুখে তাকায় তার চোখে। কি বিষণ্ণ, কি মায়াভরা দু’টি চোখ। লেন্ডারের মন এক অচেনা ব্যথায় পূর্ণ হয়ে ‍ওঠে। সে বলে-

’আমাকে মার্জনা করবেন হে মহোদয়া। আমি আপনার পরিচিত কেউ নই। দেবী আফ্রোদিতির দোহাই, আমিও আপনাকে চিনি না। কিন্তু প্রথম দেখাতেই আমি আপনার প্রেমে পড়েছি। মনে হচ্ছে, আমার হৃদয়-উপচানো প্রেম আমি শুধু আপনাকে, শুধুমাত্র আপনাকে নিবেদন করার জন্যই এতদিন জমা করে রেখেছি। আপনি আমার প্রেম গ্রহণ করবেন কিনা জানি না। তবে…

আজকের এই প্রেমোৎসবে সৌজন্য বজায় রেখে কাউকে প্রেম নিবেদনে বাধা নেই কারো। কিন্তু নিজের চরিত্রের সাথে সামঞ্জস্যহীন এই বেহায়াপনা এবং বাঁধহীন প্রেমোচ্ছ্বাস দেখে লেন্ডার নিজেই অবাক হয় খুব। তবু কথা থামায় না সে।

কিন্তু যাকে উদ্দেশ্য করে তার এই নিবেদন সে কিছুক্ষণ হা হয়ে তার চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে আকাশমুখো হয়। তারপর আকাশের নীলে কী যে খুঁজে বেড়ায় কে জানে।

নিরোৎসাহিত লেন্ডার তখন উপসংহার টানে, ‘… জবাব আপনার এখনই দেবার দরকার নেই। আমি জানি না আপনি কোথায় থাকেন, কতদূরে। কিন্তু আমি জানি এটা আপনার জন্য কতটা কঠিন। আপনার জবাবের জন্য আমি অপেক্ষা করে থাকব, রাতে, মন্দিরের ওপাশে সমুদ্র বেলায়।’

তারপর চট করে উঠে সিঁড়ি বেয়ে দ্রুত নেমে উৎসবের ভিড়ে নিজেকে আড়াল করে লেন্ডার।

[আরো পড়তে পারেন: আফরোজা ]

সন্ধ্যার পর, নব্য-যুগলেরা মাতে নাচে-গানে।

ব্যর্থ যারা তারা ভিড় করে মদ্যশালায়।

হৈ হুল্লুর, আমোদ-ফূর্তি, ক্ষোভ-বিক্ষোভ চলে অনেক রাত অবধি।

তারপর গভীর রাতে উৎসবের দেউটিগুলো নিভতে শুরু করে একে একে।

অধীর মনের গভীর প্রেম

অপেক্ষা করতে করতে পূর্ণিমার চাঁদ মধ্য আকাশ পেরিয়ে যায়। জনমানবহীন বিস্তীর্ণ বালুকাবেলায় তবুও ঠায় বসে থাকে লেন্ডার। সে আসবে এই বিশ্বাস তার মনে ক্ষীণ। কিন্তু মনের গভীর থেকে উঠে আসা অধীর প্রেম প্রতীক্ষার প্রহর গুণতে বাধ্য করে তাকে।

সে ভাবে, অন্তত ভোর পর্যন্ত অপেক্ষা করবে।

হঠাৎ মন্দিরের দিক থেকে, দূরে, সত্যি সত্যি কাউকে আসতে দেখে সে। আনন্দে লাফিয়ে ওঠে লেন্ডার। দৃষ্টি গভীর করে। একটু কাছে এলে বুঝতে পারে, এ যে তারই আরাধ্যা ।

লেন্ডার এগিয়ে যায়। একসময় মুখোমুখি দাঁড়ায় তারা। কিছুক্ষণ কোনো কথা খুঁজে পায় না লেন্ডার।

হেলেসপন্টের শান্ত ঢেউগুলো ছন্দ্যোবদ্ধ উচ্ছ্বাসে অদূরে আছড়ে পড়তে থাকে।

আকাশের চাঁদ যেন রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষার প্রহর গোণে।

‘আমি ভাবি নি আপনি আসবেন।’ অনেক চেষ্টার পর শুধু এটুকুই বলতে পারে লেন্ডার।

তারপর আবার নীরবতা।

‘তবে এখানে বসে ছিলেন যে।’ একটুক্ষণ পরে এবার নীরবতা ভাঙে সুন্দরী।

‘তা না করলে মনের সাথে প্রতারণা হয় যে। মন তো বলছে আমি আপনার প্রেমে পড়েছি।’

একটু যেন ইতস্তত করে সেই নারী। তারপর এক পা এগিয়ে যায়।

‘আমি আপনার প্রেম গ্রহণ করেছি।’

লেন্ডারের তখন ইচ্ছে হয় এক ঝটকায় বুকের ভেতর টেনে নেয় তাকে। অথবা হাঁটু মুড়ে বসে পড়ে কৃতজ্ঞতা জানায়। অথবা…

‘কে আপনি?’, তার চিন্তায় ছেদ টানে নারী।

লেন্ডার ধাতস্থ হবার চেষ্টা করে। বলে, ‘আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। নাম-পরিচয় জানার আগেই আপনি আমাকে এক তীব্র উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা থেকে মুক্তি দিয়েছেন। আমি লেন্ডার। এখান থেকে ঠিক এই বরাবর…’ আঙুল তুল দেখায় সে, …হেলেসপন্টের ওপারে এবিডসের মাইসরে আমার বাড়ি।‘

অচেনাকে চেনা

কথা শেষ করে লেন্ডার তাকায় তার দিকে। ভালবাসার পরম বিশ্বাসে হাত বাড়িয়ে দেয়। সম্মুখবর্তিনীও তাকায় তার দিকে। হাতে হাত রাখে।

‘আপনার পরিচয় জানবার কোনো ইচ্ছেই আমার নেই। এই যে, আপনি আমার হাতে হাত রেখেছেন ভালবাসার, তাকিয়েছেন প্রেমভরা চোখে, এর চেয়ে বেশি জানার আর কি থাকতে পারে আমার।’

লেন্ডারের কথা শুনে হাসে সে। যেন চাঁদ হাসে।

‘সত্যি কিছু জানতে চান না?’

‘না।’

‘কুখ্যাতি না থাকলে আমিও কিন্তু বলতাম না। সেই ছোট বেলা থেকে, যাদের চোখে শুধু লালসা দেখে বড় হয়েছি আমি, আপনি যে তাদের দলের নন, প্রথম দেখাতেই সে কথা বুঝতে পেরেছি। তাই নাম শুনিয়ে হটে যাবার সুযোগটা দিতে চাই আপনাকে।’

লেন্ডারের মনে আবার উৎকণ্ঠা দানা বাঁধতে থাকে।

‘অধমের নাম হিরো। দেবী আফ্রোদিতির নগণ্য পূজারিণী।’

লেন্ডারের বুকের মধ্যে ধ্বক করে ওঠে। সবকিছু উলট-পালট হয়ে যায়। অদেখা হিরোর প্রতি যে ক্ষোভ জমেছিল তার, তা এক মুহূর্তের মধ্যে গভীর শ্রদ্ধায় অবনত হয়।

‘আপনি হিরো? সত্যিই আপনি হিরো? তবে কি আমি, দেবতা এ্যাপেলোর আরাধ্যার সামনে দাঁড়িয়ে আছি?’

কোনো কথা না বলে হিরো লেন্ডারের বুকের মধ্যে নিজেকে শপে দেয়।

‘আমাকে ফিরিয়ে দেবে না তো তুমি, লেন্ডার?’

লেন্ডার খানিকক্ষণ হতভম্ব হয়ে থাকে। তারপর শক্ত করে হিরোকে বুকের মধ্যে চেপে ধরে।

শুরুতেই শংসয়

বাকি রাতটুকু চোখের পলকে কেটে যায়। ভোরের আলো ফুটে উঠবার আগেই বিদায় নিতে হবে লেন্ডারকে। সেস্টসে তার অবস্থান মোটেই নিরাপদ হবে না। কেননা এখানে হিরোর যারা প্রেমাকাঙ্খী ছিল তারা সবাই প্রচণ্ড ক্ষমতাধর আর শক্তিশালী। অধিকন্তু তাদের কারো কারো পক্ষে মন্দিরের প্রধান পুরোহিতের বিশেষ প্রশ্রয় ছিল।

তার অর্থ দাঁড়াল, লোকচক্ষুর সামনে দিয়ে সেস্টসে আসা বা যাওয়া কোনোটাই করতে পারবে না লেন্ডার। থাকার তো প্রশ্নই আসে না।

তবে কি প্রথম দেখাতেই সব শেষ?

এ প্রশ্নের কোনোই কুল-কিনারা করতে পারে না কেউ। এদিকে দ্রুতই ভোরের আলো ফুটে উঠতে থাকে। অবশেষে হিরোকে বুকের গভীরে টেনে নিয়ে লেন্ডার বলে, ‘তুমি একদমই ভেবো না প্রিয়তমা, এখন এই সাগর সাঁতরে সোজা মাইসরে চলে গেলে কে আমাকে দেখতে পাবে আর?‘‘‘

‘না, এ সম্ভব নয় প্রিয়তম।’ আঁতকে উঠে বুক থেকে মাথা তুলে আনে হিরো। ‘এ তো নিশ্চিত মৃত্যুর হাতে তোমাকে শপে দেওয়া।’

‘খুবই সম্ভব। তুমি নিশ্চিন্তে মন্দিরে ফিরে যাও।’

কিছুক্ষণ তর্কবিতর্কের পর হিরোকে লেন্ডারের কথা মেনে নিতে হয়। কথা হয়, লেন্ডার প্রতিদিন সূর্যাস্তের পর ওপারে হিরোর সংকেতের জন্য অপেক্ষা করতে থাকবে। হিরো মশাল জ্বালিয়ে মন্দিরের সুউচ্চ ঘণ্টাচূড়া থেকে সংকেত দিলেই সে হেলেসপন্টের উত্তাল জলে ঝাঁপিয়ে পড়বে। লেন্ডার এ তীরে না পৌঁছা পর্যন্ত হিরো মশাল জ্বালিয়েই রাখবে যেন ঢেউ আর স্রোতে লেন্ডার দিশা ঠিক রাখতে পারে।

সব ঠিক হয়ে গেলে ঊষার প্রথম আলোয় প্রথম দেখার দীর্ঘ চুম্বনে আলিঙ্গানাবদ্ধ হয় তারা। তারপর প্রথম বিরহের নোনা জল ঝরিয়ে হিরো ফিরে যায় মন্দিরে। আর লেন্ডার মাইসরের উদ্দেশে নেমে আসে হেলেসপন্টের উর্মিমুখর উষ্ণ জলে।

কঠিন লড়াই

সারাটা দিন উদ্বেগে উৎকণ্ঠায় কোথাও স্থির হতে পারে না হিরো। লেন্ডার ওপারে পৌঁছাতে পেরেছিলি কিনা এই প্রশ্ন কেবলই তাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়।

সন্ধ্যায় সূর্য ডুবে গেলে আর কিছুতেই নিজেকে ধরে রাখতে পারে না সে। সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে উঠে যায় মন্দিরচূড়ার ঘণ্টাঘরে। মশাল জ্বেলে আন্দোলনে সংকেত পাঠায়।

ঘণ্টা পেরিয়ে কৃষ্ণপক্ষের প্রথমা চাঁদ ওঠে হেলেসপন্টের ওপারে। এক মুহূর্তের জন্যও প্রজ্বলিত মশালের আন্দোলন থামায় না হিরো। ক্রমে উজ্জ্বলতর আলোয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে ছুটে আসা ঢেউ আর তাদের আলিঙ্গনরত বালুকাবেলা। কিন্তু লেন্ডারকে কোথাও দেখা যায় না। দেবী আফ্রোদিতিকে স্মরণ করে হিরো। ‘দোহাই তোমার, যদি সে না আসে, আমি ভাববো, সলিল সমাধি হয়েছে তার। তবে আমিও মরব পুড়ে।’

অবশেষে চাঁদ যখন মধ্য আকাশ ছুঁই ছুঁই তীরের কাছাকাছি সন্তরণমান লেন্ডারকে আবিষ্কার করে হিরো। ছুটে, যত দ্রুত সম্ভব ঘণ্টাঘর থেকে নেমে, সৈকতে চলে আসে সে। ততক্ষণে তীরে উঠে এসেছে লেন্ডার।

হিরোকে দেখে দু‘হাত ছড়িয়ে দেয় লেন্ডার। হিরো এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে তার বুকের মধ্যে। তারপর কল্পনায়, জল, স্রোত আর ঢেউয়ের সাথে যতটা শক্তিতে লেন্ডার লড়েছে বলে মনে হয়, ঠিক ততটা শক্তিতেই তাকে জাপটে ধরে হিরো ভালবাসার প্রতিদান দেয়।

বাকিটা রাত তারা কাটায় মন্দিরে, হিরোর কক্ষে। লালসার তীক্ষ্ণধার তরবারির সামনে হিরোর দেহের যে কামনা এতদিন কুঁকড়ে মরে পড়েছিল, ভালবাসার পালক স্পর্শে আজ তা প্রাণ ফিরে পায়। সে প্রাণের উত্তাপে জ্বর ‍ওঠে লেন্ডারের দেহে। তারপর দু’টি দেহে বয়ে যায় ঝড়।

ভোরে, দিনের আলো ফুটে ‍ওঠার আগেই লেন্ডার যে পথে এসেছিল সে পথে ফিরে যায়।

সন্ধ্যায় আবারো মশাল জ্বলে। সাগর সাঁতরে আবারো আসে লেন্ডার।

পরদিন আবারো।

[আরো পড়তে পারেন: এক কৃতজ্ঞ হাতীর গল্প ]

শীতল জলের উন্মত্ত হানা

এভাবেই চলতে থাকে দিনের পর দিন। কেটে যায় মাসের পর মাস। ঋতুর আবর্তনে আসে শীত। ভারি বিপদ দেখা দেয় তখন। জমে সঘন কুয়াশা, ছোটে কনকনে ঠাণ্ডা বাতাস। তার উপর এ অঞ্চলে ঝড়োবাতাস শুরুর এটাই সময়। শীত আর ঝড়োজলে সত্যিই খুব কষ্ট হতে শুরু করে লেন্ডারের। কিন্তু কিছুতেই সে উপেক্ষা করতে পারে না প্রজ্বলিত প্রেমের হাতছানি।

ওদিকে ঝড়ের অবিরাম আঘাতে মশালের আলো কেবলই নিভে নিভে যায়। পোষাকের আঁচলে মশালটাকে বার বার ঘিরে দিতে হয় হিরোকে।

এভাবেই কঠিন লড়াই আর উৎকণ্ঠার দীর্ঘ কাল পেরিয়ে তাদের মিলন যেন আগের চাইতেও সুখকর হয়ে ‍ওঠে।

কিন্তু একদিন আলো আর জ্বেলে রাখতে পারল না হিরো। সেদিন বাতাস ছিল জোড়ালো। ঢেউ ছিল অত্যুচ্চ। আর অন্ধকারও ছিল গহীন কালো।

ধ্রুবতারার মত যে আলোকসঙ্কেত দেখে, ঢেউয়ের সঙ্গে প্রবল তেজে যুঝে যেত লেন্ডার, সে আলো সহসা নিভে গেলে অকূল সাগরে পথ হারিয়ে ফেলে সে।

এদিকে হিরো ভাবে, আবহাওয়া খুব খারাপ দেখে লেন্ডার বুঝি আজ বাড়ি থেকেই বের হয়নি অথবা সুমদ্রে নামে নি।

কিন্তু ভাবনাটা কোনোভাবেই স্থির হতে পারে না তার। ঘণ্টাঘরের উঁচু সেই গম্বুজের উপর উৎকণ্ঠার প্রহর গুণতে থাকে সে রাতভর। ভোরের আলো ফুটে উঠতেই কূলে দেখতে পায় লেন্ডারের নিথর মৃতদেহ।

শোকে উন্মাদ হয়ে যায় হিরো। মাথার চুল আর পুজারিণীর বেশভূষা ছিঁড়তে ছিঁড়তে ছুটে আসে সে নিথর লেন্ডারের পাশে। আর সহমরণের জন্য ঝাঁপ দেয় হেলেসপন্টের অথৈ উন্মত্ত জলে।

This picture depicts the eternal love of Hero and Leander from the classic love story- ' লেন্ডার আর  হিরো: এক চিরন্তন প্রেমের গল্প'.
লেন্ডার আর হিরো: এক চিরন্তন প্রেমের গল্প

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here