হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়-এর দুটি অণুগল্প

হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়-এর দুটি অণুগল্প
হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়-এর দুটি অণুগল্প

[পশ্চিম বঙ্গের হুগলী থেকে আমাদের লেখকমণ্ডলিতে যুক্ত হয়েছে কবি হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়। ফ্লাইং পেজেসের জন্য তিনি প্রথমবারের মতো লিখেছেন দু’টি অণুগল্প। কবির লেখা অণুগল্প দু’টি যেন কাব্যের অভিযোজনা। কাব্য ও অণুগল্পের ভেদরেখা এখানে বড়ই সুক্ষ্ম- ম্রিয়মাণ। ক্রমেই সাহিত্য আকাশের নতুন তারা অণুগল্পের যাত্রা যেন সেদিকেই ধাবিত হচ্ছে। ফ্লাইং পেজেসে আপনাকে অভিনন্দন। অনেক অনেক ধন্যবাদ আমাদের সাথে যুক্ত হবার জন্য।]

অণুগল্প ১

রঙহীন ক্লাসঘরে
পশ্চিমের বারান্দাটায় যেখানে রোদ এসে পড়লেই কিছুটা গড়িয়ে যায় বলে মনে হয় সেখানে বসে সাদা পাতায় আমি একটা বাঘ আঁকলাম। দুপুরের রোদ যখন মাথা ছাড়িয়ে কিছুটা নেমে এসেছে। আমার গা দিয়ে একটা হাওয়া ছুটে গেল। সেই সঙ্গে দুটো পায়ের দাপাদাপি। চারপাশে এমন একটা উপদ্রব ঘনিয়ে তুলল যেন মনে হলো বাঘের রঙটা নিয়ে একজনের অন্তত ঘোরতর আপত্তি আছে। বাঘের দাঁড়ানোটা নিয়েও সন্দেহ উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। পাতাটা কেড়ে নিয়ে রঙ বদলানো চললো। এটা আমার কাছে এতটাই মানসিক অত্যাচার বলে মনে হলো যে, আমি বোধহয় ভবিষ্যতে আর কোনো রঙ চিনতে পারব না। আমার কমপক্ষে গায়ের জোরে ওকে সরিয়ে দিতে পারতাম। কিন্তু তা না করে আমি অন্তত একজনকে এই খবরটা দেওয়ার প্রয়োজন মনে করলাম। কাউকেই হাতের কাছে পেলাম না। একজন ছিল তাও সে আবার কালো সানগ্লাস পরেছিল। লোকটা এমনভাবে হেঁটে আমার বাড়ির দিকে আসছিল, দেখে মনে হলো তার ওপর দিয়ে যেন অনেক ঝড় বয়ে গেছে। ততক্ষণে পশ্চিম বারান্দায় বাঘের রঙ আবার বদলে গেছে। সবুজ রঙ দেখে মনে হচ্ছিল এটা যেন একটা মুখোশ। শুধু তাই নয় মনে হচ্ছিল ওর ভেতর থেকে পৃথিবীর সবচেয়ে হিংস্র কিছু বেরিয়ে আসতে পারে। কালো সানগ্লাস পরা লোকটা যে গতিতে আসছিল সবুজ রঙ দেখে তা যেন আরও কমে গেল। তার নাক কোঁচকানো দেখে মনে হচ্ছিল এই রঙকে সে খুব গভীর থেকে চেনে। ততক্ষণে লোকটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। তার শরীরী ভাষা এমন ছিল যে, সে বোঝাতে চাইছে, সে বাড়ি ফিরে যাচ্ছে না। বরং তার পা ফেলার ভঙ্গিমায় পৃথিবীর সবকিছুকে উপেক্ষার ভাব। সবুজ রঙের মধ্যে যা কিছুই মোড়া থাক না কেন তা আমি একাই সামলে উঠতে পারব। তার চলে যাওয়া আমার চোখে পড়ে নি। আমার পাতা নিয়েও আমি বিন্দুমাত্র ভাবিত নই। আমার চিন্তা হচ্ছিল পৃথিবীর বুকে একদিন সত্যিই কোনো রঙ থাকব না। তখন আমার প্রতিবেশীরা রঙহীন ক্লাসঘরে রঙের পাঠ নিচ্ছে।

[ আরো পড়তে পারেন: তিনটি অণুগল্প ]

                 
অণুগল্প ২

রূপনীলের কথা
রূপনীলের কথা বলতে অনেকদিন ধরে জড়ো হওয়া মাটি। মোটামুটি একটা স্তুপ। মাঝে মাঝেই মাথাটা বসে যায়। যেদিন কিছুক্ষণের জন্যে চূড়া অটুট থাকে সেদিন কথা বলতে ইচ্ছা করে। নিচে থেকে দেখতে অনেকটা সিংহাসনের মতো। মনে হয় আরও নিচে নেমে গেলে গলার ওপর চেপে বসবে বেশ কিছু আঙুল। পড়ে ফেলা যাবে ওপরের মানুষগুলোর দিনরাতের ধারণার অতি তরলভাব।

দুপুরের সঙ্গেই যা কথা বলে রূপনীল। শেষ বাক্য উচ্চারণের পরেই খুব হাসি পায়। মনে হয় এসব কথা পাঁচ হাজার বছর আগে বলা হয়ে গেছে। দুপুরের কাছে নিজের দৈন্যতা প্রকট হতে নিজেকে অনেক সহজ মনে হয় তার। কথার খেলা চালাতে আর ইচ্ছা করে না। চুপ করে যায়।

সন্ধে নেমে এলে রূপনীল একা পথে হেঁটে যায়। দেখে চারপাশের সবুজ চুপ করে কান পেতে আছে। এই প্রথম তার মনে হয় কতদিন সে কিছু শোনে নি। মনে হয় কথা বলাটা কত বড় মূর্খামি। যা বলেছে তা তো নিজের জানাই। কাকে সে জানাতে চেয়েছি তার পাণ্ডিত্য ? নিজের কথা বলার সময়ে কত কথা শোনার সুযোগ সে হারিয়েছে।
লজ্জায় চোখ বুজে ফেলে রূপনীল। আর ঠিক সেই সময়ে কানের ভেতর কে যেন ঢেলে দেয় মুনি বিড়ালের শেষ ডাক যে ভাত না খেয়েই বেরিয়ে গিয়ে আর ফেরে নি, জানলার পাশেই শিরিষ গাছের পাতার খসখসানি আস্তে আস্তে শুকিয়ে যাওয়া তার চোখে পড়ে নি। 

রূপনীল চোখ খুলে আর লোক হাসাতে চায় না। মাথা নিচু করে বসে থাকে। 

[আরো পড়তে বা শুনতে পারেন করোনাকালের হৃদয়স্পর্শী ছোটগল্প আফরোজা]

অণুগল্প- Flash Fiction 

Les cookies nécessaires sont absolument essentiels au bon fonctionnement du site. Cette catégorie inclut uniquement les cookies qui garantissent les fonctionnalités de base et les fonctionnalités de sécurité du site Web. Ces cookies ne stockent aucune information personnelle. online casino Tous les cookies qui peuvent ne pas être particulièrement nécessaires au fonctionnement du site Web et sont utilisés spécifiquement pour collecter des données personnelles des utilisateurs via des analyses, des publicités et d’autres contenus intégrés sont qualifiés de cookies non nécessaires.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here