না বলা কথা

ছোট্ট পরী ভেবে পায়না,ওর বাবা কেনো টগরের বাবার মতো নয়.!!

রোজ বিকেলে টগর বারান্দায় বাবার কোলে বসে পুতুল নিয়ে খেলা করে। বাবা টগরের নাক টিপে দেয়, চুল আঁচড়ে দেয়। পরীর ভীষণ ইচ্ছে হয় বাবা চুল বেঁধে দেবেন, বাবার গলা জড়িয়ে গল্পে মেতে উঠবে পরী। কিন্ত বাবা কেমন আনমনে ছবি আঁকেন, কাজ করেন। পরী এসে চুপটি করে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ হয়ে বাবাকে দেখে। বাবার ছবি আঁকা, কাজ করা দেখতে পরীর যে কি ভালো লাগে! ইচ্ছে হয় রংতুলিটা নিয়ে বাবার হাতে মুখে লাল, নীল আঁচড় দিয়ে দেয়। বাবা তো খেয়ালই করেন না, পরী সেই কখন থেকে মুগ্ধ চোখে বাবার কাজ দেখছে। পরীর দিকে হঠাৎ চোখ পড়লেই তবে মুচকি হেসে বলেন,‘কি মা কি দেখছো? দাঁড়িয়ে আছো কেনো? বসো ওই মোড়াটায়‘ বলেই কাজে লেগে যান। যেনো পরী পাশের বাড়ির কেউ, বেড়াতে এসেছে। তবু ওর মন খারাপ হয়না, ভাবে বাবা নিশ্চয়ই খুব জরুরী কাজে ব্যাস্ত।

পরীর খুব ইচ্ছে করে অসুস্থ হতে ৷ অদ্ভুত ইচ্ছে! কিন্ত কখনোই ইচ্ছে পূরণ হয়না। টগরের সেদিন জ্বর হলো, ওর বাবা কোলে নিয়ে দোকানে নিয়ে গেলো। দুহাত ভরে পাউরুটি, কমলা, বিস্কুট এসব নিয়ে বাবার কোলে চড়েই ফিরে এলো টগর হাসিমুখে। কে বলবে ওর জ্বর হয়েছে? ইশ! একদিন জ্বর হলে ঠিক বাবা এমন কোলে করে দোকানে নিয়ে যাবে,পরী স্বপ্ন দেখে।

বাবাকে ছুঁয়ে থাকার ইচ্ছায় পরীকে ছল করতে হয় কখনো। সবাই মিলে দূরে কোথাও বেড়াতে গেলে, ফিরতে রাত হলে পরী যেনো আকাশের চাঁদটা হাতে পায়। ফেরার পথে গাড়ি বা রিক্সায় বাবার কোলে করে আসে। বাড়ির কাছাকাছি এলেই ঘুমের ভাণ করে পড়ে থাকে পরী। বাবা তখন ওকে জাগাবেন না, কোলে নিয়েই ভাড়া মিটাবেন। বাসায় ফিরে বিছানায় শুইয়ে দেবেন। এর আগ পর্যন্ত বাবার বুকে লেপ্টে থাকবে পরী, বাবার ঘ্রাণ নিয়ে শান্তিতে ঘুমিয়ে পড়বে। মাঝরাতে বিদ্যুৎ চলে গেলে পরীর খুব আনন্দ হয়। বাবা যে রাতে এসে বাতাস করবেন সেই লোভ। বাবাটা কেমন যেনো দূরে দূরে থাকেন।

মাঝে হঠাৎ কদিন বাড়ি এলেন না। পরী বাড়িময় ঘুরে ঘুরে বাবাকে খুঁজে বেড়ায়। বাবার আঁকা ছবিগুলো যত্ন করে মুছে রাখে। এভাবেই বাবার কাছ থেকে আড়ালে থেকে থেকেই পরী ক্লাস ফাইভে উঠে গেলো। বাবার সাথে সংকোচ, দুরত্ব বেড়েই চললো।

এ বছরই কর্মক্ষেত্র থেকে বাবাকে বিদেশে পাঠানো হলো। পরীর ভুবনটা শূন্য হয়ে গেলো। বাবা যেদিন চলে গেলেন, পরী খাবার মুখে নিলোনা। সারা দিনরাত বাবার জন্য কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে গেলো।

যখনই আকাশে বিমান উড়ে যায়, পরী এক ছুটে উঠানে এসে বিমানের উদ্দেশ্য আকুতি নিয়ে হাত নাড়তে থাকে। এই বিমানটাই তো বাবাকে নিয়েছে, হয়তো বাবা ওখানেই বসে আছে। বাবার আঁকা ছবি, রং তুলি,গানের টুকরো স্মৃতি নিয়ে দিন কেটে যায় পরীর।

আরো পড়তে পারেন: বাবার ডায়েরি

পরী অনেক বড় হয়ে গিয়েছে, ক্লাস এইটের ফাইনাল দেবে। কতটা বছর হলো, বাবাকে দেখেনি, কন্ঠ শুনেনি পরী। বাবার একটা চিঠি পর্যন্ত পায়নি। বাবা যেনো কোথায় হারিয়ে গেলো। সকলে বলাবলি করছিলো, সে দেশে নাকি ভয়াবহ যুদ্ধ লেগেছে।

তাহলে কি বাবা…? বুক কেঁপে ওঠে পরীর।

না আসুক বাবা,না দিক চিঠি তবু যেনো সুস্থভাবে বেঁচে থাকেন বাবা, এটাই পরীর প্রার্থনা।

ছোট ভাই কে নিয়ে পাড়ার আম বাগানে ঘুরছিলো পরী সেদিন বিকেলে। টগর এসে বললো, ‘তোদের বাড়িতে কে একজন এসেছে দেখলাম। কি সুন্দর জামাকাপড় পড়া, মনে হয় শহর থেকে এসেছে, হাতে বিশাল সুটকেস।’

শহর থেকে কে আসবে? ভেবে পায়না পরী। ভাইয়ের হাত ধরে বাড়ির দিকে রওয়ানা হলো ও। ঘরে ঢুকেই চমকে গেলো পরী। চেয়ারে গল্পের নায়কের মত সুদর্শন একজন বসে আছে, মা পাশে বসে গল্প করছেন।

এতো আর কেউ নয়, তার জীবনের শ্রেষ্ঠ নায়ক, প্রিয় বাবা!

বাবাকে কেমন অচেনা লাগছে , কি বলবে ও বুঝতে পারছেনা। এতো আনন্দ হচ্ছে, তবু লুকিয়ে রেখেছে বুকের ভেতর। মাথা নিচু করে বাবার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো পরী। বাবা জিজ্ঞেস করছেন, ‘কোন ক্লাসে পড়ো মা?’

ঠিক যেনো অতিথি বেড়াতে এসেছেন, এমন প্রশ্ন।

মা অবাক চোখে কপোটভাবে বললেন, ‘নিজের মেয়ে কোন ক্লাসে পড়ে তাও খবর নেই! বদলাবেন কবে?’

পরী এখন বেশ বড় হয়েছে, বাবার উদাসী, আত্মভোলা মনটাকে একটু একটু বুঝতে পারছে। হাল্কা হেসে তাই ও উত্তর দিলো, ‘ক্লাস এইট।’

পাশে বসিয়ে মাথায় হাত রেখে বাবা বললেন, ‘কত বড় হয়ে গেছে আমার মেয়েটা! সেদিন তো একটা পুতুল ছিলে?’

পরীর চোখ ভিজে যায়। আস্তে করে উঠে পাশের ঘরে চলে যায় ও। চোখ মুছে বাবার জন্য পানি নিয়ে আসে। বাবা আসার পর থেকে পরী শুধু বাবার পাশেপাশে থাকে, ঠিক ছোট বেলার মতো। যেনো সরে গেলেই হারিয়ে যাবে বাবা।

বাবা এই ক বছর অন্য দেশে কি করেছেন, কাদের সাথে মিশেছেন, যুদ্ধে কিভাবে আটকা পড়েছিলেন এসব গল্পের ঝুড়ি যেনো পরীর কাছে খুলেই আনন্দ পান। পরীও গোগ্রাসে গিলতে থাকে বাবার গল্প। বাবা যেনো অচিন দেশের রাজপুত্র, অচেনা দেশের রূপকথা শোনাচ্ছেন।

বাবা সেদিন সেলুনে নিয়ে পরীর চুল ববকাট কাটিয়ে আনলেন। বিদেশ থেকে আনা স্কার্ট টপস পড়িয়ে,পাম সু পরিয়ে বেড়াতে নিয়ে গেলেন। কিযে লজ্জা লাগছিলো পরীর।

টগর বড় বড় চোখ করে বলেছিল, ‘তোকে দেখি মেম পরী লাগছে!’

এ কদিনে বাবার সাথে পরীর বেশ সখ্যতা হয়ে গেলো। ছোট্ট বেলার অচেনা বাবাটা চেনা হতে লাগলো। বাবার কত গল্প! জ্ঞান, বিজ্ঞান, ধর্মতত্ত্ব, নাটক, সিনেমা, গান, আর্ট কোন কিছুই বাদ যেতোনা। পরী যেনো কতো সমঝদার। সত্যি সত্যি পরী সমঝদার হয়ে উঠেছে কখন যেনো। বাবার বাউল মন, উদাসী চোখ, অন্য ভুবনে বিচরণ, পরী ঠিক বুঝে নিয়েছে। পরী যে বাবার মতোই হয়ে উঠছে দিনদিন। পুকুরের পানিতে বাতাসের ঝিরিঝিরি, শিশির বিন্দুতে রোদের ঝিলিক, বিলের জলে সবুজ ধানক্ষেতের খসখস আনন্দ, মেঠোপথের ডাক, নীল আকাশে উদাসী মেঘের চলাফেরা এসব কিছুই কোথায় যেনো নিয়ে যেতে চায় পরীকে। বাবার ভেতরের এক সত্ত্বা নিয়ে বেড়ে উঠে পরী। ভিন্ন বয়সের, ভিন্ন দুটি উদাসী পাখি ডানা মেলে দেয় একই আকাশে।

আরো পড়তে পারেন:আব্বা নামের গাছ

বাবার হাত ধরে প্রথম কলেজে গেলো পরী। বাবার মনের যে কথাগুলো কাউকে বলতে পারেনা, সেগুলো এখন পরীর কাছে বলেই স্বস্তি মেলে বাবার। পরীও বাবার সকল কথা সযত্নে রেখে দেয় মনের গোপন সিন্দুকে।

একদিন ধানক্ষেতের মতো সবুজ একটা শাড়ি এনে দিলো বাবা ওকে।

‘পরী মা পড়ে এসো তো।’

পরী শাড়ি পড়ে আয়নায় নিজেকে দেখে অবাক হচ্ছে। বাবার সামনে যেতে লজ্জা লাগছে। বাবা খুব খুশি হয়ে ওকে বাইরে বেড়াতে নিয়ে গেলেন, ওর প্রিয় আইস ক্রিম খাওয়ালেন। ওর আর ছোটবেলায় বাবাকে না পাওয়ার আক্ষেপ নেই, বাবা যে সব পূর্ণ করে দিলেন বড়বেলায়।

পরীর বিয়ের দিন বাবা ওঘর থেকে বের হলেন না। পরীর মন বাবাকে খুঁজে খুঁজে হয়রান। পরী চলে গেলে বাবা কাকে বলবেন তার মনের কথা? পরীর মন খারাপ হলে বাবা মাথায় হাত দিয়ে বলতেন, ‘আজ আকাশে এতো মেঘ জমেছে, মনে হচ্ছে এখনি বৃষ্টি নামবে।’ মুহুর্তে হেসে দিতো পরী। এখন এইতো কাঁদছে পরী, বৃষ্টি ঝরে পড়ছে ওর দু চোখে, তবুও বাবা এলেন না.! বাবাকে না দেখেই শ্বশুর বাড়ি চলে গেলো পরী।

দু’দিন ধরে পরীর প্রিয় রাজপুত্র, শ্রেষ্ঠ নায়ক, প্রিয় বাবা আইসিইউতে মৃত্যুর সাথে লড়াই করছে। করোনার কারণে পরীকে বাবার কাছে যেতে দেয়নি কেউ। বের হওয়ার কড়া নিষেধে বন্দী হয়েছে।

দুটো দিন দুই যুগের মতো যেনো, পরী ডানা ভাঙা রক্তাক্ত পাখির মতো ছটফট করে মরেছে। তার প্রাণপ্রিয় বাবাকে বুঝি আর দেখা হলোনা। কদিন আগেই বাবা মুঠোফোনে বলেছিলেন, ‘মা রে তোমার সাথে আর বুঝি দেখা হবেনা এ জীবনে।’

ভেজা চোখ নিয়ে বাবাকে বলেছিলো, ‘খুব সাবধানে থাকবেন,তবেই দেখা হবে ইনশাআল্লাহ।’

দিনরাত এক করে ডুকরে ডুকরে কেঁদে চলেছে পরী। খাওয়া, ঘুম বিসর্জন দিয়েছে। সৃষ্টি কর্তার কাছে প্রার্থনা, বাবা যেন সুস্থ হয়ে ওঠেন। আর বাবার কাছে ছুটে যাবার পথটা যেনো পরী খুঁজে পায়।

মন বলছে, পরীকে দেখলেই, পরী ছুঁয়ে দিলেই তার এই আত্মভোলা, উদাসী বাবাটা ঠিক জেগে উঠবে। বাবাকে যে জাগতেই হবে, না হলে জমে থাকা কথার ঝুড়ি কার কাছে খুলবে পরী?

পরী আজ কারো কথাই শুনবেনা। ছোট বেলায় যা বলতে চেয়েছিলো আজ বাবাকে ছুঁয়ে ঠিক বলবে পরী সে কথাটি। ‘বাবা আপনাকে ভীষণ ভালোবাসি। আপনি ছাড়া আমার বেঁচে থাকা অর্থহীন। আপনাকে সুস্থ হতেই হবে। আপনি ছাড়া বাউল, উদাসী পরীকে কে বুঝবে বাবা.??

Drugs for human use; drug efficacy study; amended notice”. vgrmalaysia.net Notice of withdrawal of approval of new drug applications”.

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here