পৃথিবী জুড়ে ফ্লয়েডের নিঃশ্বাস

কালো চামড়া-র ফ্লয়েড

কালো চামড়ার জর্জ ফ্লয়েড

কালো। পিচঢালা কালো রাস্তায় শুয়ে আছেন একজন মানুষ। না তিনি শুয়ে পড়েননি কিংবা অসুস্থতা জনিত কারণে রাস্তায় পড়েও যাননি। তাকে শুইয়ে ফেলা হয়েছে। চার-চারজন মানুষ মিলে শুইয়ে ফেলেছে একজন মানুষকে। তাদের একজন, ডেরেক চৌভিন যার নাম- সে হাঁটু দিয়ে রাস্তার সাথে চেপে ধরেছে মানুষটাকে। চেপে ধরেছে ঘাড়ের উপর। হ্যা, শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে। হাঁটুর নীচে মানুষটা ছটফট করেন। ফ্যাসফ্যাসে গলায় বাঁচার তীব্র আকুতির সাথে বার বার বলেন ‘আমি শ্বাস নিতে পারছি না… আমি শ্বাস নিতে পারছি না… আমি শ্বাস নিতে পারছি না…’। কথাটা তিনি বলতে পারেন ১৬ বার এবং মারা যান।

শ্বেতাঙ্গ পুলিশ কর্মকর্তা ডেরেক চৌভিন এর সাথে মানুষটার ব্যক্তিগক শত্রুতা নেই। পারিবারিক শত্রুতা নেই। নেই ‘গোষ্ঠি’গত শত্রুতাও! না, উনি কোন ক্রাইম (জাল ডলার বহনের দায় প্রমাণ সাপেক্ষ) করেননি। আটক করার সময় কোন রকম বাধা দেওয়া কিংবা ভায়োলেন্স করেননি। তবুও মানুষটাকে কেন এভাবে মরতে হলো? উত্তরটা আপনি শুনে রাখুন এবং মনে রাখুন- মুনষটার নাম জর্জ ফ্লয়েড এবং তাঁর গায়ের চামড়ার রং কালো।

বিক্ষোভে মানুষের মুখ

বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলন

২৫ মে মিনিয়াপলিতে নিরস্ত্র অবস্থায় পুলিশের হাতে হত্যার শিকার হন হিউস্টনের বাসিন্দা জর্জ ফ্লয়েড। বিক্ষোভে ফেটে পড়ে পুরো যুক্তরাষ্ট্র। রাস্তায় নেমে আসে মানুষ। বৈষম্যপূর্ণ অর্থনীতিতে ভেঙে পড়া মানুষ, করোনা কালের বিপন্ন মানুষ। ফুটবলার, পপশিল্পী থেকে শুরু করে অস্কারজয়ী অভিনেতা সাদা-কালো সব মানুষ। আর আমরা দেখি এবং শুনি-

‘আমাদের অস্তিত্বকে শ্রদ্ধা করো, নয়তো রুখে দেব’ প্লাকার্ড হাতে রাস্তায় গায়িকা কেহলানি।

অভিনেত্রী টেসা থম্পসন চিৎকার করছেন ‘আমেরিকা আমাদের বলে’।

পপশিল্পী আরিয়ানা গ্রান্ডে’র হাতে প্লাকার্ড ‘কালোদের জীবনও গুরুত্বপূর্ণ’।

সান ফ্রান্সিসকোর বিক্ষোভকারীরা যখন মৃত ফ্লয়েডের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে চিৎকার করে ‘আমি শ্বাস নিতে পারছি না’, সে দলে থাকেন ফক্সও। অস্কারজয়ী অভিনেতা জেমি ফক্স। তিনি বলেন, ‘আমরা অবস্থান নিতে ভয় পাই না, আমরা কোন কিছুর তোয়াক্কা করি না।’ তারকাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘হলিউডের বন্ধুরা, চলে এসো। এটা ঘরে থাকার সময় না, এটা টুইট বা খুদে বার্তা পাঠানোর সময় নয়।’

ঘানার প্রিন্স বোয়াটেং, গত বছর বার্সালোনায় খেলে যাওয়া ফুটবলার- কৃষ্ণাঙ্গ ছাড়া পৃখিবী দেখতে কেমন হতে পারে, তা সবাইকে কল্পনা করতে বলেন। স্কাই স্পোর্টসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘প্রত্যেক কৃষ্ণাঙ্গ মানুষকে খেলাধূলা থেকে বাদ দিন এবং প্রতিটি কৃষ্ণাঙ্গ অভিনেতাকে সিনেমা থেকে সরিয়ে আনুন। কেমন হবে ব্যাপারটা? বিরক্তিকর-তাই না।’ এক অভিনব প্রস্তাবও দেন তিনি, ‘এমন একটা দিন তো হতে পারে যেদিন কোন কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড় তার কাজে যাবে না। সেটা হতে পারে জর্জ ফ্লয়েডের জন্মদিনে। এর কারণ এই নয় যে আমরা আমাদের ক্লাবকে অসম্মান করতে চাই কিংবা কাজ করতে চাই না। আমরা শুধু আমাদের কৃষ্ণাঙ্গ সম্প্রদায়কে সম্মান জানাতে চাই।’ সবাইকে বর্ণ বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে ডাক দিয়ে বোয়াটেং বলেন, ‘কল্পনা করুন আমাদের সঙ্গে যদি শ্বেতাঙ্গরাও যোগ দেয়, কল্পনা করুন এই বার্তাটা কেমন হতে পারে! যদি তাঁরা বলেন, “আমি কাজ করতে যাব না বা আমি অনুশীলনে যাব না কিংবা আমি খেলব না।” কল্পনা করুন দিনটি যদি হয় শনিবার, ম্যাচের দিন। এটি একটি বড় বার্তা হতে পারে।’

বার্তা পেয়ে যাই

হ্যা, আমরা এখন জানি বার্তা হতে পারে অনেক কিছুই। ফ্লয়েড যে হোটেলের নিরাপত্তা কর্মী ছিলেন, গান্ধী মহল নামের সেই হোটেল মালিক যখন বলেন ‘হোটেল পুড়েছে পুড়ুক, ন্যায় বিচার চাই’। যখন বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত সেই মালিক রুহেল ইসলাম আন্দোলনরত সেই মানুষদের জন্যই খাবার রাধেন, যারা তাঁর হোটেল পুড়িয়েছে; যখন তিনি বলেন, ‘আমরা আবার প্রতিষ্ঠান বানিয়ে ফেলতে পারবো কিন্তু একজন মানুষ বানাতে পারবো না’! তখন আমরা বার্তা পেয়ে যাই। যখন আমেরিকান পুলিশ দায়িত্ব আর মানবতার মধ্যে মানবতাকে বেছে নেয়। বিক্ষোভকারীদের দমন করতে এসে হাঁটু গেড়ে বিক্ষোভে সংহতি জানায়, দুঃখিত বলে জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুতে তখন খুব জোরালো বার্তা পেয়ে যাই। বার্তা পেয়ে যাই ভবিষ্যৎ পৃথিবীর। যে পৃথিবীতে কালো চামড়া কোন পাপ নয়। মানব সৃষ্ট ভীষণ বৈষম্যের এই পৃথিবীতে মানুষ হওয়াটা কোন পাপ নয়। করোনা কালের বিপন্ন এই পৃথিবীতেও মানুষ যখন জর্জ ফ্লয়েডের জন্য রাস্তায় নামে, সংগঠিত হয় সাদা-কালো ভুলে; তখন বার্তা পেয়ে যাই, জেনে যাই- মানুষ একদিন ঠিক জেনে যাবে, সাদা হোক কালো হোক মানুষ মানুষই। মানুষ ঠিক জেনে যাবে, মানুষ হয়ে মানুষকে হত্যা করা যায় না। সে মানুষ সাদা হোক কালো হোক, বিপন্ন কিংবা পর্যদূস্ত- যাই হোক। এমনকি মানুষ একদিন ঠিক উপলব্ধি করবে মানুষ হয়ে মানুষকে অপমানও করা যায় না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here