বাবার সাথে আমার স্মৃতি

এই তো কিছুদিন আগে ঊনিশে এ পা দিয়েছি। অনেক বড় হয়ে গিয়েছি। যদিও আব্বু কিন্তু এখনো আমাকে বাবু বলে ডাকে।

যখন ছোট ছিলাম কথা ছিল একটাই। বাইরে আমাকে কেউ বাবু নামে চিনে না তাই বাবু ডাকা চলবে না। আমার ব্যাপারটা ছিল বড় হয়েছি তো, বাবু বলে ডাকলে মান সম্মান থাকবে নাকি!

বাবু নাম নিয়ে একটা মজার ঘটনাও আছে। আমি তখন ক্লাস ফাইভে পড়ি। স্কুল বাসে উঠেছি। `তোমরা কেউ বাবুকে দেখেছো?’ আব্বু খোঁজ করছে।

আমি তো সর্বসাধারণের কাছে বাবু নামে পরিচিত নই! তাই আমার বন্ধুরা কেউ আমাকে চিনলো না। ততক্ষণে সারা বাসে বাবুর খোঁজ চলছে। আমি তো বুঝতে পারলাম আমারই খোঁজ করা হচ্ছে। তারপর আব্বুকে দেখা দিলাম। তখন আমি ভাবছিলাম, `বন্ধু মহলে মানসম্মান সবই গেল।’

ছোটবেলায় আব্বুকে সাজাতে খুব ভালো লাগতো। কপালে টিপ দিয়ে দিতাম,ঘোমটা দিয়ে দিতাম। আব্বুর চুলগুলো খুব বেঁধে দিতে ইচ্ছা করতো। কিন্তু তা তো আর করতে পারতাম না কারণ আব্বুর মাথায় তো চুলই ছিল না। তাই ছোট মনে প্রশ্ন আসতো,আব্বুর চুলগুলো কে নিয়ে গেল?' কৌতুহলী মনে জিজ্ঞেস করলে আব্বু বলতো,‘মা,আমার চুলগুলো তো কাক নিয়ে গিয়েছে।’ তখন খুব ইচ্ছা করেছিল কাকটার খোঁজ করে আব্বুর চুলগুলো উদ্ধার করে আনার। কিন্তু না পাওয়া গেল কাকটাকে, না উদ্ধার হলো আব্বুর চুল।

আমাদের একটা ক্যামেরা ছিল। সেই ক্যামেরা দিয়ে আব্বুর বড় মেয়ে হুুমু আপুর সাথে আব্বুর অনেক সুন্দর সুন্দর ছবি আছে। কিন্তু আমি যখন হয়েছি তখন নাকি ক্যামেরা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। তাই আমার ছোটবেলার ছবি আব্বুর সাথে নেই বললেই চলে। এজন্য তো আমার এখনো ভীষণ আক্ষেপ। আব্বু তখন ক্যামেরাটা ঠিক করলে না কেন? তাহলে তো তোমার সাথে আমার ছোটবেলার অনেক ছবি থাকতো।

ছোটবেলায় ট্রেনভ্রমণ আমার ভীষণ ভালো লাগতো। কিন্তু এখন ট্রেনের সেইসব স্মৃতি মনে পড়লে ভীষণ হাসি পায়। ঢাকায় যাচ্ছি, ট্রেন ছাড়তে এখনো বেশ কিছুক্ষণ বাকি আছে। আব্বু ট্রেন থেকে নেমে বাইরে গেছে। আমার তো খালি ভয় করতো, ভাবতাম ট্রেন যদি আব্বুকে ছেড়েই চলে যায়! আর থাকতে পারছিলাম না, ভাবছিলাম যদি এখনই ট্রেন ছেড়ে দেয়! এই ভেবে অঝোরে কান্না করে দিতাম। পরে আব্বুর দেখা পেয়ে হাফ ছেড়ে বাঁচতাম। তবে ট্রেনে যাতায়াতের সময় আব্বুর জন্য এভাবে কান্না করা যেন খুবই স্বাভাবিক ছিল।

সন্ধ্যা ৭ টা থেকে আমাদের পড়ার সময়। কিন্তু আব্বু  যদি বাইরে যায় তাহলে আমরা দুই বোন টিভি দেখতে বসতাম। হাতে জুতা, লাইট অফ। শুধু টিভির লাইট জ্বলতো।আব্বু কলিং বেল দিলেই  টিভি আস্তে করে বন্ধ করে টিপটিপ পায়ে ভিতরের রুম এ গিয়ে বলতাম, ‘কে?’

আমার বোন ততক্ষণে পড়ার টেবিলে বসে গিয়েছে। আমরা দুই বোন এখনো ভাবি, আব্বু কি আসলে বুঝতো?

আব্বুর হাতে জীবনে একবারই একটা থাপ্পড় খেয়েছিলাম। সেই ঘটনা এখনো মনে আছে। ঢাকা থেকে কেবল বাসায় ফিরেছি। বাসায় এসেই চলে গেলাম খেলতে। খেলতে গিয়েই কানে ভীষণ ব্যাথা পেয়ে যাই। একে তো বারণ করার পরও খেলতে গিয়েছি, তার উপর এরকম কাণ্ড ঘটিয়ে এসেছি। আব্বু দেখে দিল এক থাপ্পড়। পরে আমার কানে তিনটা সেলাইও লেগেছিল। 

একবার সবাই ঢাকা গিয়েছি বেড়াতে। আব্বুর ছুটি শেষ হয়ে যাওয়াতে আব্বুকে আগেই চট্টগ্রাম এ ফিরে যেতে হচ্ছিল। আব্বু যথারীতি রওনা হলো। কিন্তু হঠাৎ খবর পেলাম ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী ট্রেনটি দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে। আব্বুর মোবাইল ফোনও বন্ধ আসছিল। তখন আমি অনেক ছোট। কারো অবস্থাই মনে নেই। মনে আছে আমার অবস্থা। শান্তিনগরের বাসার বারান্দায় গিয়ে অঝোরে কান্না করেছিলাম। পরে আব্বু ফোন করে জানিয়েছিল অন্য ট্রেনে দুর্ঘটনা হয়েছিল। এখনো ঘটনাটা মনে পড়লে মনটা খারাপ হয়ে যায়।

ছোট বেলায় সব বিষয়ে ৯০ এর উপর নম্বর পাওয়া একটা নিয়মই ছিল। কিন্তু একবার তার ব্যতিক্রম ঘটল। ক্লাস ফাইভে প্রথম সাময়িক পরীক্ষায় অংকে ৭৮ পেয়েছি। আমার  জন্য তখন সেটা ছিল ভীষণ বড় ব্যাপার। বাসায় এসে তো অঝোরে কান্না করেছিলাম। আব্বু আমাকে এসে সান্তনা দিচ্ছে। একসময় দেখি আমাকে কান্না করতে দেখে আব্বু নিজেই কান্না করে দিয়েছে। তখন আব্বুকে আমি সান্ত্বনা দিচ্ছিলাম।

এইতো গেল ডিসেম্বর মাসে আব্বুর সাথে মেলায় গিয়েছিলাম। আব্বুর সাথে রাগ করি কোনো কারণে। আব্বু ততক্ষণে ফুচকার অর্ডার দিয়ে দিয়েছে। কিন্তু আমাকে তো আমার রাগে অটল থাকতে হবে এবং আব্বুকে দেখাতে হবে যে আমি রাগ করেছি। তাই নিজের প্রিয় ফুচকাই খেলাম না। পরে অবশ্য  আব্বু রাগ ভাঙিয়েছিল।

গেল রোজার ঈদ। করেছি একটা অকাজ। আব্বুতো ভীষণ রেগে গেল। বকাটা আমারই প্রাপ্য ছিল,  কিন্তু বকাটা হয়ে গেল সর্বসাধারণের। আব্বু আসলে আমাকে বকাঝকা করতে পারে না।

এখন সবকিছু বন্ধ। আব্বুও বাসায়। আব্বুকে প্রায়ই আব্বুর প্রিয় পাস্তা বানিয়ে খাওয়াতে পারি। খুব মজা হয়না আমি জানি, কিন্তু আব্বু বলে কোথা থেকে শিখেছি, এতো মজা।

আব্বু সারাদিন শুধু খবর আর টকশো দেখে। সকালে খবর, দুপুরে খবর,বিকালে খবর। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে খবর। আব্বু, খবর কম দেখবা। ব্রেইন এর রেস্ট হবে।আর আমার গাড়ি লাগবে না,সাইকেলই লাগবে।

আসলে সব বাবার সাথে তাদের মেয়ের গল্পগুলো অনেক আদর আর ভালোবাসার।বাবা

দিবসে সকল বাবার প্রতি সহস্র শ্রদ্ধা।

Were you thinking about a succulent-themed wedding. buy cialis Of course, you were, those are awesome.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here