মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস: জনযুদ্ধ ৩

মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস: জনযুদ্ধ

প্রথম কিস্তি: মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস: জনযুদ্ধ
দ্বিতীয় কিস্তি: মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস: জনযুদ্ধ ২

মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস: জনযুদ্ধ: তৃতীয় কিস্তি

মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস জনযুদ্ধ: পাঁচ

এদিকে নৌকায় আরো একজন। উৎকণ্ঠিত। নির্ঘুম। তার অবস্থান আলতাফ, ওবায়দুল, হামিদুর বা হায়াতুন্নেসার একেবারেই বিপরীতে। নাম তার খান আব্দুল আজাদ। পুড়াপাড়া থানার নতুন অফিসার ইনচার্জ। বিশেষ নিয়োগে, হাই কমান্ডের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে নতুন চাকরি। এই চাকরি তার কাছে ধর্ম। দেশ রক্ষার এক পবিত্র মিশন। ফিরছে সে জেলা সদর থেকে নিজ কর্মস্থল পুরাপাড়া থানায়।

ক’দিন ধরেই আজাদ খবর পাচ্ছে আলতাফের দল দ্রুতই বড় হচ্ছে। প্রতিদিন নতুন নতুন লোক যোগ দিচ্ছে তার দলে। মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডের সাথে যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে। এখন তার শুধু অভাব অস্ত্রের। ট্রেনিংয়ের বেশির ভাগটািই চালাতে হচ্ছে ডামি অস্ত্র দিয়ে।

ডামি অস্ত্র দিয়ে ট্রেনিং!

কথাটা ভাবলেই আজাদের ঠোঁটের কোণায় একটা শ্লেষের হাসি ফুটে উঠত ক’দিন আগেও।

`অস্ত্র ছাড়া ট্রেনিং চলে না, যুদ্ধ তো চলেই না। অস্ত্র এমন এক বস্তু যা হাত বাড়ালেই পাওয়া যায় না। চাই যতই না যোগাযোগ হোক আলতাফের সেক্টর কমান্ডের সাথে। সেখান থেকে অস্ত্র আসা কি অত সোজা!’ এমনটাই ভাবত সে। ভেবে সুখি হত। কিন্তু চার পাশের ঘটনার ঘনঘটায় ক্রমে তার ঠোঁটের সে হাসি উবে গেছে।

অস্ত্রের জন্য মুক্তিযোদ্ধারা চারদিকে থানায় থানায় আক্রমণ করছে। টহলদার পাকবাহিনী এমন কি তাদের ছোটখাট ছাউনিগুলোও বাদ যাচ্ছে না এসব আক্রমণ থেকে। ইতোমধ্যেই কোটালিপাড়া থানা থেকে অস্ত্র লুট করে নিয়ে গেছে হেমায়েত বাহিনী।

মরিয়া হয়ে উঠেছে আলতাফও। যেকোনো মূল্যে অস্ত্র চাই তার। আজাদের ধারণা যেকোনো দিনই আলতাফ অস্ত্রের জন্য আক্রমণ করে বসতে পারে আশেপাশের যেকোনো থানা।

আক্রমণ করলেই যে তার থানার পতন ঘটবে একথা ভাবত না আজাদ। আস্থাটা তৈরি হয়েছিল পুলিশ বাহিনীর জন্য নয়। তার ভরসা ছিল জাহিদ। জাহিদ তাকে আশ্বাস দিয়েছিল যেকোনো মূল্যে মুক্তিবাহিনীর গতিবিধি সে নিয়ন্ত্রত রাখবে এ এলাকায়। তার থানার দুই-চার মাইলের মধ্যে প্রবেশ করতে পারবে না পাকিস্তানের দুষমণরা।

যে রাতে জাহিদ তাকে এ আশ্বাস দিয়ে বেরুল থানা থেকে, সে রাতেই আক্রান্ত হল জাহিদের বাড়ি। জাহিদ তখনো ছিল বাড়ি ফেরার পথে তাই রক্ষা পেয়েছিল। মুক্তির দল উঠানে দাঁড়িয়ে, ফাঁকা গুলি ফুটিয়ে, ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান দিয়ে ভাল করেই ঘোষণা করে গেছে তাদের অস্তিত্ব।

এটাকে আমলে না নিয়ে পারে নি আজাদ। তাই সে গিয়েছিল সদরে। জেলার নেতাদের সাথে কথা বলেছে। ঢাকায় যোগাযোগ করেছে হাই কমান্ডের সাথে।

শীঘ্রীই টহলের পরিবর্তে পাকবাহিনীর স্থায়ী ক্যাম্প গড়ার ব্যবস্থা করে ফিরছে সে সদর থেকে।

আরো পড়তে পারেন: উপন্যাস- প্রেম অথবা হত্যা রহস্য

মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস জনযুদ্ধ: ছয়

সেই ছোট্ট দলটি এসে যখন পৌঁছায় দিলালপুর স্কুল মাঠে মধ্যরাত ছুঁই ছুঁই। দলবল সহ এগিয়ে এসে শক্ত করমর্দনে, আন্তরিক আলিঙ্গনে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানায় কমান্ডার আলতাফ।

আলতাফ অত্র অঞ্চলের একজন ডাকসাইটে ফুটবল খেলোয়াড়। স্ট্রাইকার হিসেবে তার খ্যাতি পুরো জেলা জুড়ে। কিন্তু গেল প্রায় এক বছর ধরে খেলার মাঠের চাইতে রাজনীতির মাঠই তাকে টানতো বেশি। বঙ্গবন্ধুর প্রতিটা নির্দেশনার প্রতি নজর রাখছিল সে গভীর মনোযোগে। ৭ই মার্চের ভাষণের ‘… এবং তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো’ কথাটি তাকে বেশ আলোড়িত করেছিল। পঁচিশে মার্চের পর বঙ্গবন্ধুর কথার তাৎপর্য টের পায় সে। কি আছে তার কাছে? তাই নিয়ে ভাবতে শুরু করে। তার দু’দিন পরে গ্রামে এসে উপস্থিত হয় রাজার বাগ পুলিশ লাইন থেকে পালিয়ে আসা হাবিলদার প্রিয়তম বন্ধু চুন্নু মিয়া। সাথে একটা রাইফেল।

দুই বন্ধু মিলে আলোচনায় বসে। চুন্নুকে কেন্দ্র করেই দল গড়তে চেয়েছিলো আলতাফ। চুন্নুর যুক্তি ছিল আলতাফের দিকে। আলতাফ এলাকায় বহূল পরিচিত। নানাদিকে তার ভক্ত সমর্থক। তাকে ঘিরেই দল হোক। চুন্নু থাকবে ট্রেনিংয়ের দায়িত্বে।

শেষ পর্যন্ত তাই হলো।

প্রথমেই ট্রেনিং নিতে শুরু করলো আলতাফ। তারপর যুক্ত হতে থাকলো নতুন নতুন যোদ্ধা। বিশেষ ট্রেনিংয়ের জন্য ছোটাে ছোটো কিছু দলকে ইতোমধ্যেই পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে ভারতে।

দল বাড়ছে হু হু করে। প্রতিদিন নতুন নতুন ছেলে-পেলে আসছে। এখন সমস্যা একটাই। অস্ত্র। এত অস্ত্র পাবে কোথায় তারা?

যেখানে থেকে যেভাবেই হোক অস্ত্র চাই আলতাফের। তাই এসআই ওবায়দুলের পক্ষ থেকে যখন প্রস্তাব আসে লুফে নেয় সে।

খাবার আগে কিছুতেই মিটিংয়ে বসতে রাজি ছিল না আলতাফ। এতটা পথ হেঁটে এসেছে সবাই। যেরকম বৃষ্টি-বাদলার দিন পথে বিশ্রাম নেবার কোনো সুযোগ পায় নি কেউ নিশ্চিত। কিছু খেতে পাওয়া তো দূরের কথা।

খাবার বিলম্বটুকু এখন কিছুতেই মেনে নিতে পারল না হামিদুর । যে করেই হোক তাকে রাত পোহাবার আগেই থানায় ফিরতে হবে। হায়াতুন্নেসা আর বাচ্চাগুলোর কথা মনে হলেই সে অন্তরে বার বার কেঁপে কেঁপে উঠছে। না না, ওদের এভাবে একা ফেলে তার চলে আসা মোটেই উচিত হয়নি। যত দ্রুত সম্ভব আলোচনা সেরে ফেলার জোর আবেদন জানায় সে।

ওবায়দুল আগেই তার পরিবার নিরাপদ স্থানে পাঠিয়ে দিয়েছে। রিসালতের পরিবারের কেউ এখানে নেই। রইসের এক ভাই আর মা। তারা থাকে থানা থেকে বেশ দূরে। সে এলাকা রাজাকার মুক্ত, প্রায় সবাই স্বাধীনতার পক্ষের লোক। রাজাকারেরা খবর পেলে যেভাবেই হোক বাঁচার একটা চেষ্টা অন্তত করতে পারবে বলে আশা করা যায়। কিন্তু খবর হয়ে গেলে হামিদুরের পরিবারের কারো বেঁচে থাকার কোনো সম্ভাবনা নেই। তাই পথের দেরিটা এসআই ওবায়দুলের কপালেও চিন্তার ভাঁজ ফেলে দিয়েছে। এই পথটুুকু আসতে মধ্যরাত হয়ে যাবে তা সে ভাবতেও পারে নি। তাই সেও যত দ্রুত সম্ভব মিটিং সেরে ফেরার পথে বেরিয়ে যাবার পক্ষেই মত দিল।

আলোচনায় বসার আগে বারান্দায় চলতে চলতে হামিদুর ওবায়দুলের হাত চেপে ধরে।
‘স্যার..’
‘হামিদুর সাহেব, আমি আপনার মনের অবস্থা বুঝতে পারছি। আসলে আমিও বুঝতে পারি নাই যে, এখানে পৌঁছাতে এত সময় লেগে যাবে। যাহোক, চিন্তা করবেন না। যত তাড়াতাড়ি পারি কথা শেষ করব আর সব কূল রক্ষা পায় এমন সিদ্ধান্তই নেব।’

হামিদুর আর কথা বলে না।

বারান্দার পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে আলতাফ রাসেলের সঙ্গে প্রয়োজনীয় কথাবার্তা সেরে নেয় এবং কিছু নির্দেশনা দেয়।

মিটিং বসে সহকারি শিক্ষকদের কক্ষে, হারিকেনের অনুজ্জ্বল আলোয়। এক পক্ষে এরা চারজন অন্যদিকে কমান্ডার আলতাফ এবং তার ক’জন সহকারি। হাবিলদার চুন্নু আছে বিশ্রামে। সকালে ট্রেনিং চালাতে হবে তাকে।

আলতাফের অনুরোধে প্রথমেই কথা বলেন ওসি ওবায়দুল।

‘কমান্ডার আলতাফ, আমি প্রথমে আপনাকে অনেক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই। অনেক ঝুঁকি নিয়ে আপনি আমাদের উপর আস্থা রেখেছেন। আমাদেরকে আপনার সঙ্গে- আপনাদের সঙ্গে দেখা করার অনুমতি দিয়েছেন। আর এই সাক্ষাতের ব্যবস্থা করেছেন।’

এটুকু বলেই থামে ওবায়দুল। অপেক্ষা করে আলতাফের বক্তব্য শোনার। বুঝতে পেরে আলতাফ বক্তব্য শুরু করে।

‘প্লিজ স্যার, আপনি আমাকে কমান্ডার বলে ডাকবেন না। আমি বয়সে আপনার অনেক ছোট। ছোট ভাই বলে ভাববেন, নাম ধরে ডাকবেন। । আর ঝুঁকির কথা যে বলতিছেন, সে নিয়ে অবশ্যই আমি চিন্তাভাবনা করিছি। আপনারা এই থানার পুরানা লোক। যুদ্ধের আগে আপনাগোর ভূমিকা সম্পর্কে আমাগোর ধারণা পরিষ্কার। তাই যুদ্ধের ময়দান হইলিও আমার বা আমাগোর কারো মনে কোনো সন্দেহ জাগে নাই। আপনারা আসছেন। আপনাগোরে আমরা সাদরে স্বাগত জানাই। এখন থিকা আমরা সবাই মুক্তিযোদ্ধা। দেশের জুন্যি একসাথে লড়াই করব, এটাই আমাগোর পণ।’ এটুকু বলে থামে আলতাফ। তাকায় ওবায়দুলের দিকে। ‘তবে স্যার, একটা ব্যাপারে জিজ্ঞাস্য ছিল।’

‘অবশ্যই কমান্ডার, বলেন।’ কমান্ডার সম্বোধনটা ইচ্ছে করে বেশ জোর দিয়েই বলে ওবায়দুল, যেন মুক্তিযুদ্ধের প্রতি তার এবং তার দলের আনুগত্যটা বেশ স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়। এবার আর এ নিয়ে কোনো আপত্তি করে না আলতাফ তার জিজ্ঞাস্য সম্পর্কেই কথা বলে, ‘আমাগোর থানার নতুন ওসি সম্পর্কে জানতি চাই। লোকটা কেমন?‘

‘কট্টর পাকিস্তানপন্থী। খুবই ধূর্ত। ওসি হবার তুলনায় বয়স কম। পুলিশের ট্রেনিং নাই নিশ্চিত। তাই আমার কাছে মনে হয়, বিশেষ রিক্রুট।’

‘হুম। আমাদের কাছেও রিপোর্ট এ রকমই। আইচ্ছা যা হোক। এবার আপনাগোর কথা বলেন। মানে আপনাগের চিন্তাভাবনা কি। কিভাবে আমরা একসাথে কাজ করব?’

‘দেখুন কমান্ডার, আমাদের অবস্থাটা বেশ জটিল। আপনাদের সাথে যোগাযোগের আগ পর্যন্ত আমরা বেশ হতাশায় ছিলাম। যোগাযোগের পর একটা আশার আলো দেখতে পেয়েছি। আমাদের প্রাথমিক পরিকল্পনা ছিল অস্ত্রশস্ত্র যা আনতে পেরেছি আজ তা এখানে রেখে থানায় ফেরত যাওয়া। এগুলো আনা গেছে কেননা এখন পর্যন্ত হামিদুর মানে ইনি…’, ইঙ্গিতে হামিদুরকে দেখায় ওবায়দুল, ‘আছেন মালখানার দায়িত্বে। থানায় দালাল যারা আছে, এরই মধ্যে আমাদের ব্যাপারে তাদের সন্দেহ গভীর হচ্ছে। তারা বেশ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। এ এলাকায় পাক বাহিনীর স্থায়ি ক্যাম্প গড়ার ব্যাপারে তারা জোর তদবির চালাচ্ছে। যতদূর শুনতে পাচ্ছি দু’একদিনের মধ্যেই হানাদার বাহিনী এ থানায় স্থায়ি ক্যাম্প গড়বে।

আমাদের মধ্যে আরো অন্তত চারজন মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের ব্যাপারে বদ্ধপরিকর। তাদের সহ আমরা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব- সম্ভব হলে কালই আরো অস্ত্রশস্ত্র সহ আপনাদের সাথে স্থায়িভাবে যোগ দিতে চাই।’

এটুকু বলে থামে ওবায়দুল। একটু নড়েচড়ে বসে। একটু যেন চিন্তার ভাঁজ ফুটিয়ে তোলে কপালে। তারপর বলে, ‘কিন্তু এখানে আসার পর পথের দেরিটা আমাকে বেশ ভাবিয়ে তুলেছে। আমরা…’ এবার সত্যিই ভীষণ চিন্তিত শোনায় তার কণ্ঠ, ‘…আমরা ভোরের আগে ফিরে যেতে পারব তো? মানে আমাদের ফিরে যাওয়াটা খুবই জরুরী। কেননা হামিদুর সাহেবের স্ত্রী-পরিবারকে আমরা এখনো নিরাপদ স্থানে সরাতে পারিনি। এখনো থানা কোয়ার্টারে রয়ে গেছে তারা।’

এবার আলতাফও নড়েচড়ে বসে। হামিদুরের কণ্ঠ থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসতে শোনা যায় ।

‘আমার মনে হয় না ফিরে গেলে রাত পোহাবার আগে আর আপনারা পৌঁছাতি পারবেন।’ বলে কমান্ডার আলতাফ। ‘আমি এও জানি দিনের আলোয় পথচলা আপনাদের পক্ষে একেবারেই সোম্ভাব নয়। জাহিদের লোকজন চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।’

‘এ অবস্থায় এখন তবে করনীয় কী?’ গভীর চিন্তিত সুরে প্রশ্ন করে ওবায়দুল।

প্রশ্ন শুনে কমান্ডার আলতাফ বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। এসআই ওবায়দুল আলতাফের মনোভাব বোঝার জন্য আর কোনো কথা বলে না। হামিদুরের মধ্যে সময় ক্ষেপণের উকণ্ঠা তুঙ্গে উঠে যেতে থাকে। সেপাই দু’জন উসখুস করে। ঘরের ভেতর সবাই নীরব-নিস্তব্ধ কিছুক্ষণ।

নীরবতা ভাঙে কমান্ডার আলতাফ-

‘আপনারা এখানে আসা মাত্রই বিষয়টি আমি শুনেছি। অবস্থা অনেক জটিল সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নাই। শোনার পর থিকা চিন্তার মধ্যেই আছি। সমাধান তো একটা বার করতিই হবি। আমাদের সহযোদ্ধার একটা পরিবারকে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে রাইখা আমরা আমরা তো আর চুপ করে বসে থাকতে পারি না।’

হামিদুর আলতাফের কথার ভেতর থেকে একটা আশার আলো খুঁজে বের করার চেষ্টা করে। নিজেও একটা সমাধান বের করার জন্য ভাবে। কিন্তু কিছুই খুঁজে পায় না বলে হতাশ চোখে আলতাফের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।

‘সেই তখন থিকা শুধু একটা সমাধানই আমার মাথায় ঘোরপাক খাতিছে। এখন যদি আপনারা রাজি হন।’ আলতাফ এতটুকু বলে থামে।
সবাই উৎকর্ণ হয়ে উঠে। হারিকেনের টিমটিমে আলোয় দৃষ্টি নিবদ্ধ করে আলতাফের চোখে মুখে।

‘তার জুন্যি সময় অনেক কম। সিদ্ধান্ত নিতে হবি তড়িৎ। কাজে নামতি হবি তার চেয়েও দ্রুত।’

ওবায়দুল ভাবতে চেষ্টা করে কথাটা কোন দিকে যাচ্ছে। হামিদুরের শিড়দাঁড়া শক্ত হয়ে পড়ে।

‘আজ এখনই রওনা হয়ে কাল ভোরের মধ্যিই এ্যাটাক করে দখল নিতি হবি থানার।’

প্রস্তাব শুনে প্রথমে স্তম্ভিত হয়ে যায় ওবায়দুল । প্রথমেই তার চোখে ওসি কাদেরর ধূর্ত ও ধারালো চেহারাটা ভেসে ওঠে। তারপর জাহিদ রাজাকার। ‘এটা কি করে সম্ভব?’ ভাবে সে। কিন্তু ক্রমেই তার ভাল লাগে এই ভেবে যে, হামিদুরের পরিবারের জন্য কমান্ডার সত্যিকার অর্থে কিছু করতে চাইছে।

প্রস্তাবের বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে হামিদুরের মনেও। কিন্তু সে সে-প্রশ্নকে মনের মধ্যে মোটেও ঠাঁই দিতে চায় না। যেন অথৈ সাগরে আশার একটা ভেলা দেখতে পেয়েছে সে। এটা হাতছাড়া করা কোনোভাবেই উচিত হবে না। ‘হতেই তো পারে। আর তাতে করে তার পরিবারটি রক্ষা পেতে পারে শত্রুদের কবল থেকে। কিন্তু কাদের? শয়তানটা একটা বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।’ ভাবে সে।

‘এ কি সম্ভব?’ এবার নীরবতা ভেঙে প্রশ্ন তোলে ওবায়দুল। উদ্দেশ্য তর্কের মাধ্যমে আলতাফের পরিকল্পনা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নেয়া।

‘কেন না?।’ পাল্টা প্রশ্ন আলতাফের।

‘কারণ… কারণটা আমার কাছে তত পরিষ্কার নয়। মানে আমাদের শক্তি সম্পর্কে আমার খুব পরিষ্কার ধারণা নেই। আমাদের কি সে শক্তি আছে? অস্ত্র-শস্ত্র? যোদ্ধা?’

‘হুম্। এসব প্রশ্ন অবান্তর না। বিভিন্ন সীমান্তে আমাদের যেসব ছেলেরা ট্রেনিং নিতিছে তাদের বেশির ভাগই এখনো ফিরা আসতি পারে নাই। যারা আসি পৌঁছেছে তাদের সব গ্রুপের মধ্যি এখনো সমন্বয় হয় নাই । তবুও আক্রমণটা আমি করতি চাই তিন কারণে। এক. হামিদুর সাহেবের পরিবারকে বাঁচাবার আর কোনো পথ আপাতত আমি দেখতি পারতিছি না। দুই. এই আক্রমণ আমাদের হাতে নতুন অস্ত্রভাণ্ডার আইনে দিবি। তিন. আপনারা যুদি আমাগোর সাথে যোগ দিতি পারেন, যুদি আপনাগের শরীরী কুলায় তবে সফলতার সম্ভাবনা শতভাগ। কারণ এখন আমরা নিশ্চিত জানি থানায় এখন যারা আছে তাদের মধ্যিও আমাগোর লোক আছে। আর রাজাকারগের কথা যুদি বলেন ওরা আমার গুনার মধ্যিই নাই। জাহিদ আর দুইচাইর জন ছাড়া আর কেউ বন্দুক নিয়া সোজা হয়্যি দাঁড়াতি পারবি আমার মনে হয় না।’

‘কিন্তু সেই দখল আমরা ধরে রাখতে পারব কতক্ষণ?’

‘আপনার কি মনে হয়?’

‘বড়জোর দুই ঘণ্টা? হুম তার বেশি নয়। তার মধ্যেই জেলা সদর থেকে সর্ব শক্তি নিয়ে উপস্থিত হয়ে যাবে পাক বাহিনী।’

‘তার চেয়ে বেশি সময় কি আমাদের প্রয়োজন আছে? এই যুদ্ধে আমাদের লক্ষ্য হবে দুটি। এক. হামিদুর সাহেবের পরিবারকে নিরাপদ স্থানে সরায়ে আনা। দুই. থানায় অস্ত্র-শস্ত্র গোলাবারুদ যা আছে তা নিজেদের কব্জায় আনা।’

ওবায়দুল আর কোনো কথা বলে না। আলতাফ সিদ্ধান্ত জানায়, ‘আপনাদের অনুমতি না নিয়েই আমি আশেপাশে আমাদের যে তিনটি ছোট ছোট গেরিলা দল আছে তাদের খবর পাঠিয়ে দিছি। তারা মুসুরকান্দি বটতলায় মিলিত হবি। কামাল, তুমি আমাগের সবাইকে বাইর হতি বল। জলদি।’

হামিদুর উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে। তার খুব ইচ্ছে করে আলতাফকে একটা স্যালুট দেয়। এই কিছুক্ষণ আগেও যে ছিল কেবল একটি অপরিচিত নাম, সে কেমন করে তার হৃদয়ের বিশাল একটা জায়গা দখল করে নিলো। যেন কত জনমের আপন- ভাই, বন্ধু। তার পরিবারকে রক্ষা করার জন্য এই এতটুকু সময়ের মধ্যে কি বিশাল এক সিদ্ধান্তে চলে গেলো সে।

‘চলেন সবাই।’ বলে আলতাফ।

সবাই উঠে পড়ে।

সবার সঙ্গে হামিদুরও বেরিয়ে আসে বারান্দায়। কিন্তু অন্য একটি ভাবনা, একেবারে অন্যরকম চিন্তা কিছুতেই তার পিছু ছাড়ছে না। থানার দখল না হয় নেয়া হল, তার পরিবারও উদ্ধার পেল, অস্ত্র-শস্ত্রও হাতে আসল, কিন্তু তারপর? তারপর পাকবাহিনী এসে চারদিকে হানা দেবে। গ্রামের পা গ্রাম ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করবে, নীরিহ মানুষকে হত্যা করবে, মা-বোনের সম্ভ্রম কেড়ে নেবে। এটা ঘটবে। হামিদুর জানে এর অন্যথা হবে না। এরই মধ্যে এ অভিজ্ঞতা সে লাভ করেছে। আর এ সব কিছু ঘটবে শুধুমাত্র তার পরিবারটিকে উদ্ধারের জন্য এই অভিযানটি চালানো হচ্ছে বলে। সে অন্য একটা পন্থা ভাবার চেষ্টা করে।

হামিদুরের ইচ্ছে করে বিষয়টি নিয়ে ওবায়দুল ও আলতাফের সঙ্গে কথা বলতে। কিন্তু এ বিষয়ের অবতারণা মানে নতুন করে কালক্ষেপণ। সেটাও সে চায় না।
চলতি পথেও নিশ্চয়ই কথা বলার একটা সুযোগ তৈরি করা যাবে। সে চেষ্টাই সে করবে বলে মনে মনে ঠিক করে।

Si vous préférez acheter Cialis contre la dysfonction érectile, vous pouvez acheter Cialis en ligne sur ce site. Achat Cialis Generique En France Sans surprise, une achat cialis generique France grande partie des biens saisis tourne simplement par manquer une fois que les tribunaux disent Big Brother à le restituer. Acheter Cialis générique pas cher. viagrasansordonnancefr Encore une fois, vous perdez, mais cette fois, après beaucoup d’efforts déployés et de frustration Dans certaines pharmacies en ligne, certains produits sont sans ordonnance.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here