লকডাউনে শিশুর শিক্ষা: শিখনক্রিয়া সচল রাখার পাঁচটি উপায়

ছবিটি শিশুর শিক্ষা লকডাউনে এর প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

পড়তে সময় লাগতে পারে ৭ মিনিট ৫০ সেকেণ্ড। পাঠ শুনুন: ৮ মিনিট ২৩ সেকেণ্ড।

করোনা ভাইরাস: এক সর্বগ্রাসী সঙ্কট

লকডাউনে আছে গোটা বিশ্ব।

এমন বিশ্ব কে কবে দেখেছে?

দেশ। দেশের ভেতরে জেলা- তার ভেতরে এলাকায় এলাকায় লকডাউন। লকডাউন চলছে জীবন বাঁচাতে, সর্বগ্রাসী সঙ্কট সৃষ্টিকারী করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ রুখে দিতে।

কিন্তু অনিবার্য এই পরিস্থিতিতে অন্য সবার মতই শিশুর শিক্ষা ও স্বাভাবিক জীবনেও নেমে এসেছে স্থবিরতা।

স্থবির হয়ে গেছে স্কুল। খাঁ খাঁ করছে শ্রেণিকক্ষ, করিডোর, বিদ্যালয়প্রাঙ্গণ। শিশুরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে সহপাঠী, খেলার সাথী, শিক্ষক, প্রতিবেশি, বন্ধু থেকে। থমকে গেছে শিশুদের স্বাভাবিক চলাফেরা, খেলাধুলা, সামাজিকীকরণমূলক মিথষ্ক্রিয়া (Interactions for socialization)।

সবার মতই শিশু জীবনেও এ এক সর্বগ্রাসী সঙ্কট।

এই সঙ্কট কালে গৃহে বন্দী বিচ্ছিন্ন শিশুদের শিখন ব্যবস্থা সচল ও কার্যকর রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যালয় ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় দূরশিক্ষণ (Distance learning mode) প্রক্রিয়ার আওতায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের জন্য টেলিভিশনে পাঠ-প্রদর্শন ও অন্যান্য কিছু ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু এটা কোনোভাবেই যথেষ্ট হতে পারে না।

শিশুর শিক্ষা কেন্দ্র: স্কুল- ফাঁকা ক্লাস রুম

এ সময়ে ঘরোয়া ব্যবস্থায় শিশুর শিখন-অভ্যাস সক্রিয় রাখা প্রয়োজন। এতে সঙ্কট পরবর্তী সময়ে একদিকে সহজেই শিশু স্বাভাবিক শিখন প্রক্রিয়ায় নিজেদের সম্পৃক্ত করতে সক্ষম হবে। অন্যদিকে শিশুদের শারিরীক, মানসিক, আবেগিক ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় করোনা উদ্ভূত পরিস্থিতির নেতিবাচক প্রভাব কম হবে।

এখানে চলমান বাস্তবতায় শিশুদের শিখনক্রিয়া সচল রাখার জন্য অভিভাবকগণের গ্রহণীয় ৫টি কৌশলের উল্লেখ করা হল। প্রয়োগ করে দেখুন, অবশ্যই ভাল ফল পাবেন।

১. দৈনন্দিন রুটিন তৈরি ও তা অনুসরণ করতে শিশুকে উৎসাহিত করুন

লকডাউনে শিশুর মাঝে শৃঙ্খলার অভ্যাস সচল রাখার জন্য একটি দৈনন্দিন রুটিন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে এ সময়ে, বিশেষ করে, পরিবারের সবার সার্বক্ষণিক সান্নিধ্যে শিশুরা যখন ছুটির আমেজে আছে তখন ঘরোয়া ব্যবস্থায় দৈনন্দিন রুটিন অনুযায়ী জীবনাচার নিঃসন্দেহে একটি কঠিন কাজ। সম্ভাব্য ক্ষেত্রে শিশুর সাথে আলোচনা করে, শিশুকে সম্পৃক্ত করে শিশুর পছন্দ-অপছন্দকে গুরুত্ব দিয়ে শিশুর জন্য রুটিন তৈরি করুন। পড়ালেখা, বিভিন্ন ধরনের খেলা, শরীরচর্চা, বিনোদন ইত্যাদি রুটিনে অন্তর্ভুক্ত করুন। খেয়াল রাখবেন রুটিন যেন শিশুর জন্য আনন্দদায়ক হয়। সতর্ক থাকুন যে, রুটিন অযথা যেন শিশুর স্বাভাবিক জীবনাচরণকে ভারাক্রান্ত করে না ফেলে। রুটিন অনুসরণে শিশুর প্রতি আন্তরিক হোন। কঠোরতার নীতি পরিহার করে বন্ধুসূলভ আচরণের মাধ্যমে রুটিন অনুসরণে শিশুকে উৎসাহিত করুন ও নিজে শিশুকে পর্যাপ্ত সময় দিন।

২. নিয়মিত ঘরোয়া শরীর চর্চা ও নানাবিধ সক্রিয় কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করুন

গবেষণায় দেখা গেছে শরীর চর্চা শিশুর শুধুমাত্র শারিরীক উন্নয়নের জন্যই সহায়ক নয়, বরং শিশুর মানসিক, আবেগিক উন্নয়নেও এর ইতিবিাচক প্রভাব রয়েছে। কাজইে দিনের পর দিন গৃহে আবদ্ধ শিশুর জন্য নানামুখী শরীর চর্চার সুযোগ সৃষ্টি করুন। কাঠামোগত শরীর চর্চার বিকল্প হিসেবে আনন্দদায়ক শারীরিক অঙ্গভঙ্গি সহকারে ঘরোয়া খেলাধুলার ব্যবস্থা করুন। শারীরিকভাবে সক্রিয় খেলাধুলা ছাড়াও শিশুর সৃজনশীল চিন্তা প্রক্রিয়াকে সক্রিয় করে এমন খেলাধুলা সংযুক্ত করুন। সতর্ক থাকুন যাতে শিশু এ সময় মোবাইল ফোন ও গেইম-এ আসক্ত না হয়ে পড়ে। যে কোন অবস্থায় বয়সোনুযায়ী শিশুর আগ্রহ, চাহিদা, আবেগ ইত্যাদিকে গুরুত্ব দিন।

৩. সম্ভাব্য মিথষ্ক্রিয়মূলক (Interactive) সামাজিক যোগাযোগের (Socialization) সুযোগ সৃষ্টি করুন

করোনা মহামারী রোধে বর্তমান সময়ে অন্যতম কৌশল হিসেবে ‘সামাজিক দূরত্ব’ বজায় রাখার ব্যাপার সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে ‘সামাজিক দূরত্ব’ বলতে মূলত শারিরীকভাবে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তির দূরত্ব বজায় রাখাকেই নির্দেশ করা হচ্ছে। শিশুরা অবশ্যই এই ‘সামাজিক দূরত্ব’ বজায় রাখবে। তবে মানসিক ও আবেগিক দিক থেকে সামাজিক যোগাযোগ চর্চার বিকল্প উপায় ব্যবহার করে আত্মীয়-স্বজন ও অন্য শিশুদের সাথে যোগাযোগ, সবার খোঁজ-খবর নেয়া ইত্যাদি প্রক্রিয়ায় শিশুদের সক্রিয় রাখা জরুরি। এক্ষেত্রে মোবাইল, সম্ভব হলে ভিডিও কলের মাধ্যমে অন্যান্যদের সাথে শিশুদের যোগাযোগের সুযোগ সৃষ্টি করে দিন। তা সম্ভব না হলে শিশুদের সাথে আত্মীয়-স্বজন ও অন্যান্য ব্যাপারে আলাপ-আলোচনা করুন। এতে শিশু মানসিক ও আবেগিকভাবে সামাজিকতা চর্চার অভ্যাস সচল রাখতে সক্ষম হবে।

৪. করোনা সংক্রান্ত নেতিবাচক আলোচনার মাধ্যমে শিশুদের অযথা আতঙ্কিত করবেন না

করোনা মহামারির সঙ্কটময় সময়ে সব সময় বাড়িতে আপনার অবস্থান করাকে শিশুর জন্য ইতিবাচক সুযোগ হিসেবে উপস্থাপন করুন। বর্তমান পরিস্থিতিতে শিশুদের পর্যাপ্ত সময় দিন। লেখাপড়ায় শিশুদের সক্রিয় সহযোগিতা করার পাশাপাশি তাদের সাথে খেলাধুলা করুন। মনীষীদের জীবনী থেকে শিশুবান্ধব অভিজ্ঞতা ও নৈতিকতা সম্পর্কে আলাপ আলোচনা করুন। শিশুর সামনে বা শিশুর সাথে করোনা সংক্রান্ত নেতিবাচক আলোচনা করে শিশুদের অযথা আতঙ্কিত করবেন না। তবে অবশ্যই শিশুকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার শিক্ষা দিন ও এ সম্পর্কে তাকে সচেতন করে তুলুন।

৫. শিশুদের আচরণ পর্যবেক্ষণ করুন ও প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সহায়তা করুন

বৈচিত্র্যপূর্ণ শিশুদের আচরণ। করোনা মহামারির এই পরিস্থিতিতে আপনাকে নিরবিচ্ছিন্নভাবে বাড়িতে অবস্থান করতে হচ্ছে। এই অবস্থানকে কাজে লাগান। শিশুর আচরণ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করুন। শিশুকে নতুনভাবে আবিষ্কার করুন। প্রয়োজনে শিশুর আচরণ পর্যবেক্ষণ করে প্রতিদিন তার আচরণের নানাবিধ সাধারণ দিকসমূহ যেমন- তার পছন্দ, অপছন্দ, তার যোগাযোগ দক্ষতা, কথা বলার ধরন, আচরণের ইতিবাচক দিক, অধিকতর উন্নয়নের সুযোগ এমন আচরণসমূহ লিপিবদ্ধ করুন। ইতিবাচক আচরণের জন্য শিশুকে প্রশংসা করুন ও উৎসাহিত করুন। উন্নয়নের সুযোগ রয়েছে শিশুর এমন আচরণ উন্নয়নে সহায়তা করুন। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে শিশু সম্পর্কে আপনার নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতা আপনার শিশু মনোবিজ্ঞানী বন্ধু বা বিশেষজ্ঞের সাথে শেয়ার করুন ও তার পরামর্শ গ্রহণ করুন। এই পরিস্থিতিতে শিশুর সার্বিক উন্নয়নে অভিভাবক হিসেবে আপনি আপনার শিশুকে সক্রিয় সহায়তা করুন এবং আপনার শিশু ও তার দৈনন্দিন বৈচিত্র্যময় কর্মকাণ্ড উপভোগ করুন।

Happy girl who express the hope for closing of lock down. Her name is Sara.

আশা করা যায়, খুব শীঘ্রই করোনা মহামারির চলমান বৈরিতা কেটে যাবে। ঘরের বাইরে শিশুরা আবার উঠবে সরব হয়ে । তাদের কোলাহল-কলরবে আবার জীবন ফিরে পাবে বিদ্যালয়প্রাঙ্গণ। খেলার মাঠে ছুটবে তারা, বেড়াবে পার্কে, চড়বে নানা রকম রাইডে।

তবে আপনি বর্তমানে অবশ্যই যত্ববান হোন। সতর্ক থাকুন, কোনো অবস্থাতেই যেন আপনার শিশু শিক্ষায় বা মানসে ভবিষ্যতে কোনো দীর্ঘস্থায়ী সমস্যায় পতিত না হয়।

পূর্ববর্তী নিবন্ধরোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা উন্নত করে বয়স কমানোর উপায়
পরবর্তী নিবন্ধকরোনা উদ্বেগ: নিয়ন্ত্রণের ১০ কৌশল
ড. এ. কে. এম. বদরুল আলম দীর্ঘদিন যাবৎ শিক্ষা, ভাষাশিক্ষা, শিশুশিক্ষা ও শিক্ষক-শিক্ষা এবং উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট নানাবিধ কর্মকাণ্ডের সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত আছেন। প্রাথমিক স্তরের বর্তমান জাতীয় শিক্ষাক্রমের আওতায় জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) কর্তৃক প্রবর্তিত চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির বাংলা বিষয়ের শিক্ষক নির্দেশনা গাইডের তিনি অন্যতম লেখক। এছাড়া তিনি বাংলা বিষয়ের জাতীয় শিক্ষাক্রম, পাঠ্যসূচি ও পাঠ্যপুস্তক রিভিউ কমিটির সদস্য হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি নটরডেম কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে শিক্ষায় সম্মাানসহ ব্যাচেলর ও মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে বৃটেনের বাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষায় 'শিখন ও শিক্ষণ' বিষয়ে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি চীনের সাউথওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে 'শিক্ষাক্রম ও নির্দেশনা' বিষয়ে পিএইচডি করেছেন। পেশাগত কারণে তাঁর বিভিন্ন দেশে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা রয়েছে। এর মধ্যে যুক্তরাজ্য, ভারত, শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইন, আরব-আমিরাত, চীন, উগান্ডা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here