শ্যাম্পু এল কেমন করে

ছবিটি শ্যাম্পু আবিষ্কারক শেখ দীন মুহাম্মদের।

পড়তে সময় লাগতে পারে ৫ মিনিট ২০ সেকেণ্ড। পাঠ শুনুন: ৬ মিনিট ০৫ সেকেণ্ড

ভূমিকা

শ্যাম্পু।
শব্দটা খাঁটি ইংরেজী মনে হলেও গোড়া কিন্তু সংস্কৃতে।
সংস্কৃতের চ্যান্পু যার মানে হাত দিয়ে মাথা মালিশ- ইউরোপের পশ্চিমা উচ্চারণে হয়েছে শ্যাম্পু।

তো এই চ্যান্পু ইউরোপে গেল কেমন করে।

আজ আমরা আপনাদের শোনাব সেই গল্প।

শেখ দীন মুহাম্মদ: শৈশব ও কৈশোর

গল্পের নায়ক শেখ দীন মুহাম্মদ। জন্ম পলাশী যুদ্ধের মাত্র দু’বছর পর, ১৭৫৯ সালে, তখনকার বঙ্গ প্রদেশের পাটনায়। পাটনা এখন ভারতের বিহারের সাথে যুক্ত।

দীনের পূর্বপুরুষেরা ক্ষৌরকার অর্থাৎ নাপিত ছিলেন। বাবা কাজ করতেন স্থানীয় মোগল প্রশাসনে। পরে যোগ দেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিতে ।

মোগলদের রসায়ন বিদ্যা সম্পর্কে দীনের বাবার বিশেষ ধারণা ছিল। সেই সূত্রে বালক দীন বেশ অল্প বয়সেই সাবান, তেল, সুগন্ধী সহ নানা রকমের প্রসাধনী বানানোর কৌশল রপ্ত করে ফেলে। ধারণা করা যায়, বিভিন্ন রাসায়নিক বস্তুর রোগ-নিরাময়ী গুণাবলী সম্পর্কেও সেই বয়সেই সে বিশেষ জ্ঞান অর্জন করেছিল।

মাত্র এগার বছর বয়সে পিতৃহারা হবার পর দীন মায়ের তত্ত্বাবধানে পাটনা রাজার আশ্রয়ে বড় হতে থাকে। রাজবাড়ির কাছেই ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ফৌজি দপ্তর ও ব্যারাক। নানান কারণে ব্যারাকে যাতায়াত ছিল দীনের। ফৌজে সার্জন হিসেবে তখন কাজ করতেন ইঙ্গ-আইরিশ বংশোদ্ভূত ক্যাপ্টেন গডফ্রি ইভান বেকার। বেকারের সঙ্গে পরিচয় হয় দীনের। কিছুদিনের মধ্যেই অসমবয়সী ভিন্ন সংস্কৃতির ভিনদেশি এই দু’জনের মধ্যে একটা গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বেকার দীনকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ফৌজে শিক্ষানবীশ চিকিৎসক হিসেবে কাজ করার সুযোগ করে দেন।

১৭৮২ সালে চাকরী ছেড়ে দেন বেকার। উদ্দেশ্য ভারত ভ্রমণ শেষে দেশে ফেরত যাওয়া। পাটনা ছাড়ার সময় তরুণ দীন বেকারের সঙ্গী হবার ইচ্ছা প্রকাশ করে। মায়ের অমত ছিল। কিন্তু ছেলের কঠিন জেদের কাছে শেষ পর্যন্ত তা পরাভূত হয়।

শেখ দীন মুহাম্মদের ইউরোপ যাত্রা

বেকারের সাথে বাড়ি ছাড়ে দীন। টানা দু’বছর ধরে ঢাকা, কোলকাতা, আসানসোল, মাদ্রাজ সহ ভারতের নানান শহর, জনপদ, বন, জঙ্গল, পাহাড়, মরুভূমি ঘুরে ১৭৮৪ সালে বেকার স্থায়িভাবে বসবাসের জন্য পিতৃভূমি আয়ারল্যান্ডের কর্ক সিটিতে ফিরে আসেন। সঙ্গে যুবক শেখ দীন মুহাম্মদ।

ভালোভাবে ইংরেজী রপ্ত করার জন্য দীনকে ভর্তি করা হয় স্থানীয় একটি স্কুলে। এখানে সে সহপাঠিনী হিসেবে পায় সুন্দরী আইরিশ তরুণী জেইন ডেলিকে। অচিরেই ভাল বন্ধুত্ব হয়ে যায় দু’জনের। বন্ধুত্ব থেকে প্রেম। দুই মেরুর দুই তরুণ-তরুণীর প্রেম-আখ্যান জানাজানি হলে বাধা হয়ে দাঁড়ায় জেইনের পরিবার।

দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর পরিবারের প্রবল বাধার মুখে ১৭৮৬ এর কোনো এক সময় শ্বেতাঙ্গিনী জেইন আপনজনের সকল মায়া ত্যাগ করে তাম্রবর্ণ দীনের হাত ধরে গৃহত্যাগ করে।

শ্যাম্পু আবিষ্কারক শেখ দীন মুহাম্মদের বই ‘দ্য ট্রাভেলস অব দীন মুহাম্মদ’

এসময় দীন ক্যাপ্টেন বেকার ও তাঁর ভারত ভ্রমণের উপর ‘দ্য ট্রাভেলস অব দীন মুহাম্মদ’ শিরোনামে ভ্রমণ কাহিনী লিখে ফেলে। ১৭৯৪ সালের ১৫ জানুয়ারি তারিখে এই ভ্রমণ কাহিনী গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় । কোনো ভারতীয়র প্রকাশিত প্রথম ইংরেজি বই এটি।

গল্পের পরের অধ্যায় ১৮১০ সালের। ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় জেইন-দীন পরিবার এবছর লন্ডনে চলে আসেন। শেখ দীন মুহাম্মদ খুলে বসেন ইংল্যান্ডের প্রথম ভারতীয় খাবারের রেস্তোরাঁ ‘হিন্দুস্তান কফি হাউজ’। কিন্তু ক্রমাগত লোকসানের মুখে ক’বছরের মধ্যেই লন্ডনের পাট চুকিয়ে ফেলতে হয় তাদের।

অবশেষে শ্যাম্পু বানিয়ে ব্রাইটনে সাফল্য

১৮১৪ সালে তাঁরা বসতি গড়েন ব্রাইটনে। দীন মুহাম্মদ শৈশবের বিদ্যা-বুদ্ধিকে কাজে খাটান এখানে। বেশ আড়ম্বর করে স্থানীয় পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন একটি স্নানাগার- মুহাম্মদের স্নানঘর।

বিজ্ঞাপনের মূল আকর্ষণ ছিল একটি স্বাস্থ্যবার্তা। লিখা হয়-

‘এখানে স্নান গ্রহণ করলে গিঁট ও জোড়ার ব্যথা, পুরানো মচকানো ব্যথা, বাতজনিত ব্যথা দূর হয়। চুল পড়া বন্ধ হয়।’

স্নান দেয়ার সময় দীন মুহাম্মদের স্নানাগারে নানা রকম সুগন্ধী তেল সহযোগে শরীর ও চুল-মাথা মালিশ করে দেয়া হত। চুলে-মাথায় মালিশ করার এই কাজটিকে সংস্কৃত ভাষায় বলা হয় চ্যান্পু করা। দীন তাঁর স্নানাগারে এই সংস্কৃত শব্দটিকেই চালু করেছিলেন। পশ্চিমা উচ্চারণে এই ‘চ্যান্পু করা’ই হয়ে যায় শ্যাম্পু করা।

কিছুদিনের মধ্যেই মুহাম্মদের স্নানাগারের খবর সারা ইংল্যান্ডে ছড়িয়ে পড়ে। দূর-দূরান্ত থেকে এসে লোকজন ব্রাইটনের গোসলখানায় ভিড় জমাতে থাকে। হাসপাতালের ডাক্তাররা পর্যন্ত রোগীদের ব্রাইটনে গোসল নেয়ার পরামর্শ দিতে শুরু করেন। ব্রাইটন পুরসভা দীন মোহাম্মদকে ড. ব্রাইটন খেতাবে ভূষিত করে। ড. ব্রাইটনের খ্যাতি এতটাই তুঙ্গে উঠে যায় যে, ইংল্যান্ডের রাজ প্রাসাদে একটি নতুন পদ সৃষ্টি করা হয়- যার নাম শ্যাম্পু সার্জন। রাজা চতুর্থ জর্জ ও চতুর্থ উইলিয়ামের শ্যাম্পু সার্জন হিসাবে নিয়োগ পান ড. ব্রাইটন শেখ দীন মুহাম্মদ।

ব্রাইটন- যেখানে প্রথম শ্যাম্পু ব্যবহৃত হয়।

১৮৫০ সালের দিকে ব্রাইটনের স্নানাগারটিতে সুগন্ধি তেলের পরিবর্তে সুগন্ধি সাবানে চুল শ্যাম্পু করার রীতি চালু করা হয়। সেই থেকে মানব সভ্যতা পেয়ে যায় একটি নতুন প্রসাধন- শ্যাম্পু।

১৮৫১ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি ৯২ বছর বয়সে এই কীর্তিমান উদ্যোক্তা ব্রাইটনে মৃত্যুবরণ করেন।

তথ্যসূত্র: https://en.wikipedia.org/wiki/Dean_Mahomed

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here